বাংলাদেশের আকাশপথে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য উড়োজাহাজ চলাচল করে। বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে রানওয়ে, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, ফ্লাইট নিরাপত্তা, এভিয়েশন সিকিউরিটি এবং এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম—পুরো বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখতে কাজ করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (Civil Aviation Authority of Bangladesh—CAAB)।
সহজভাবে বলতে গেলে, CAAB বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং দেশের বিমানবন্দরসমূহের পরিচালনা ও উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা।
CAAB-এর কার্যক্রম শুধু বিমানবন্দর পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের পুরো বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সঙ্গে সংস্থাটি যুক্ত।
দেশের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে CAAB গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন, টার্মিনালসহ বিমানবন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিরাপদ ও কার্যকর রাখার কাজ এর অন্তর্ভুক্ত।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের কার্যক্রমে CAAB-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
আকাশে উড়োজাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা CAAB-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। Air Traffic Management (ATM) ব্যবস্থার মাধ্যমে উড়োজাহাজের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, উড্ডয়ন ও অবতরণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং নির্ধারিত আকাশপথে ফ্লাইট পরিচালনায় সহায়তা করা হয়।
এ কাজে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের পাশাপাশি রাডার, নেভিগেশন ও যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে পরিচালিত এয়ারলাইন্স ও উড়োজাহাজগুলো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মান অনুসরণ করছে কি না, তা তদারক করা CAAB-এর অন্যতম দায়িত্ব।
এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট, উড়োজাহাজের এয়ারওয়ার্দিনেস, ফ্লাইট অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিধিবিধান পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে কর্তৃপক্ষ।
একটি উড়োজাহাজ পরিচালনায় শুধু পাইলট নয়, বিভিন্ন কারিগরি ও পেশাগত জনবলের প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী পাইলট, এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন এভিয়েশন পেশাজীবীর লাইসেন্সিং ও যোগ্যতা তদারকিতে CAAB দায়িত্ব পালন করে।
বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচলকে অবৈধ হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রী ও ব্যাগেজ স্ক্রিনিং, বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ, নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে CAAB কাজ করে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে দেশের এভিয়েশন সিকিউরিটি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করাও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কোনো এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে তাকে নির্ধারিত আইন ও নিরাপত্তা মান অনুসরণ করতে হয়। প্রয়োজনীয় অনুমোদন, সার্টিফিকেশন ও তদারকির ক্ষেত্রে CAAB নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।
দেশি এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনাকারী বিদেশি এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধিবিধান বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা ICAO-এর সদস্য রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য ICAO নির্ধারিত Standards and Recommended Practices (SARPs)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের এভিয়েশন ব্যবস্থা পরিচালনা ও উন্নয়নে CAAB কাজ করে।
এর ফলে বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে সহায়তা হয়।
যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়। নতুন টার্মিনাল, রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে উন্নয়ন, নেভিগেশন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং যাত্রীসেবার অবকাঠামো সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে CAAB গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একজন যাত্রী হয়তো সরাসরি CAAB-এর সঙ্গে যোগাযোগ না করেই পুরো যাত্রা শেষ করেন। কিন্তু বিমানবন্দরে প্রবেশ থেকে উড়োজাহাজ নিরাপদে আকাশে ওঠা এবং গন্তব্যে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক ব্যবস্থার পেছনেই CAAB-এর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি রয়েছে।
নিরাপদ রানওয়ে → এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল → বিমানবন্দরের নিরাপত্তা → এয়ারলাইন্সের সেফটি তদারকি → নেভিগেশন সুবিধা → বিমানবন্দর অবকাঠামো—এসব মিলিয়েই একটি নিরাপদ বিমান চলাচল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ হলো বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)।
তাই CAAB-এর কাজ কেবল বিমানবন্দর পরিচালনা নয়; বাংলাদেশের আকাশসীমায় নিরাপদ বিমান চলাচল নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে এয়ারলাইন্স, উড়োজাহাজ, পাইলট, বিমানবন্দর, এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও এভিয়েশন সিকিউরিটি—পুরো বেসামরিক এভিয়েশন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটির ভূমিকা রয়েছে।
মন্তব্য করুন