এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ৮০ লাখ। অথচ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসেই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুট মিলিয়ে বিমানবন্দরটি দিয়ে ৮৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৯ জন যাত্রী চলাচল করেছেন। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর পাশাপাশি তাঁদের বিদায় জানাতে কিংবা স্বাগত জানাতে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বিমানবন্দরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম আট মাসে আন্তর্জাতিক রুটে ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ জন এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫৮ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। অর্থাৎ বছরের চার মাস বাকি থাকতেই বিমানবন্দরটির ঘোষিত বার্ষিক সক্ষমতার তুলনায় ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৯ জন বেশি যাত্রী চলাচল করেছেন।
২৪২ দিনের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার ২৩৩ জন যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছেন। তবে এই সংখ্যার বাইরে যাত্রীদের স্বাগত জানাতে কিংবা বিদায় দিতে আসা স্বজন ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও বিমানবন্দর এলাকার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে বিদেশগামী কিংবা বিদেশফেরত স্বজনকে বিদায় জানানো ও স্বাগত জানাতে পরিবারের একাধিক সদস্যের বিমানবন্দরে আসার প্রচলন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন যাত্রীর সঙ্গে ১০, ২০ এমনকি ২৫ জন পর্যন্ত স্বজন ও পরিচিতজন বিমানবন্দরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের এমন উপস্থিতি আবেগ ও আন্তরিকতার প্রকাশ হলেও বিমানবন্দরের মতো ব্যস্ত স্থানে অতিরিক্ত জনসমাগম অন্য যাত্রীদের চলাচল এবং সেবা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে আগমনী এলাকার ক্যানপি, গাড়ি ওঠানামার স্থান এবং যাত্রীদের অপেক্ষার জায়গায় অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ পরিবহনের জন্য ট্রলি রাখা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু দর্শনার্থী যাত্রী পৌঁছানোর অনেক আগেই বিমানবন্দরে এসে ট্রলি নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন।
কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রলি নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ায় প্রকৃত প্রয়োজনের সময় অন্য যাত্রীদের ট্রলি পেতে অসুবিধা হতে পারে।
অথচ ট্রলির মূল উদ্দেশ্য হলো যাত্রীদের লাগেজ পরিবহনে সহায়তা করা। প্রয়োজনের আগে ট্রলি দখল করে রাখলে একই ট্রলি পর্যায়ক্রমে একাধিক যাত্রীর ব্যবহারের সুযোগ কমে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ট্রলি যথাস্থানে রাখতে বা অন্য যাত্রীদের ব্যবহারের সুযোগ দিতে অনুরোধ করলে কিছু ব্যক্তির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ফলে শুধু ট্রলির সংখ্যা বাড়ানো নয়, বিদ্যমান ট্রলির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীকে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, কাস্টমস এবং পরিবহনসহ বিভিন্ন সেবা দিতে হয়।
এর সঙ্গে অতিরিক্ত দর্শনার্থীর উপস্থিতি যুক্ত হলে বিমানবন্দরের প্রবেশপথ, আগমনী এলাকা ও যানবাহন চলাচলের স্থানে চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে একই সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ করলে যাত্রীদের পাশাপাশি তাঁদের স্বজনদের ভিড় সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে যাত্রী চলাচলের মোট সংখ্যা দিয়ে প্রতিটি সেবার মান বা কার্যক্রমের প্রকৃত চাপ নির্ধারণ করা যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রী ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি, ট্রলির প্রাপ্যতা এবং কর্মীদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন বা দর্শনার্থী উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগমনী ও বহির্গমন এলাকার নির্ধারিত স্থানে যানবাহন সর্বোচ্চ দুই মিনিট অবস্থানের নিয়মও জানানো হয়েছে।
এসব নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো অপ্রয়োজনীয় ভিড় কমানো, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ও সেবা সহজলভ্য করা।
তবে নিয়ম কার্যকর করতে কর্তৃপক্ষের তদারকির পাশাপাশি যাত্রী ও তাঁদের স্বজনদের সচেতন সহযোগিতাও প্রয়োজন।
বিমানবন্দর শুধু একটি যাতায়াতের স্থান নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। এখানে শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সেবাগ্রহীতা ও দর্শনার্থীদেরও।
একজন যাত্রীকে স্বাগত জানাতে পরিবারের সবাই বিমানবন্দরে না এসে সীমিতসংখ্যক প্রতিনিধি গেলে ভিড় অনেকটাই কমানো সম্ভব। একইভাবে প্রয়োজনের আগে ট্রলি দখল না করা, ব্যবহার শেষে নির্ধারিত স্থানে ফিরিয়ে রাখা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলা যাত্রীসেবা সহজ করতে পারে।
বেবিচকের পক্ষ থেকে ট্রলি ব্যবস্থাপনা, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীসেবায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিমানবন্দরের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শুধু কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী না করে যাত্রী ও দর্শনার্থীদের আচরণগত বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সবার সহযোগিতা ছাড়া একটি ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাঙ্ক্ষিত সেবার পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন।
তথ্যসূত্র: ২০২৬ সালের জানুয়ারি–আগস্ট সময়ের প্রদত্ত যাত্রী পরিসংখ্যান এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দর্শনার্থী ও যানবাহন ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নির্দেশনা।
মন্তব্য করুন