aviation
প্রকাশিত: 5 October 2026, 8:51:24 Pm
অনলাইন সংস্করণ

১০ বছর ধরে দখলে শাহজালালের মূল্যবান অ্যাপ্রোন, ১২ পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ এবার বিক্রি হবে ভাঙারি হিসেবে

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

প্রায় এক দশক ধরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা দখল করে থাকা ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করা হলেও বিমান হিসেবে বিক্রির উপযোগিতা হারিয়ে ফেলায় এবার সেগুলো স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি হিসেবে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বেবিচক। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক গত ১৬ জুলাই এ-সংক্রান্ত চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠান।

মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। নিলামে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দর এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।

১ লাখ ৯২ হাজার বর্গফুটের বেশি অ্যাপ্রোন আটকে আছে

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, পরিত্যক্ত ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি এবং অ্যাঞ্জেল এয়ারওয়েজের একটি।

সব মিলিয়ে উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকা দখল করে রেখেছে।

বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা। এখানে উড়োজাহাজ পার্কিং, যাত্রী ও কার্গো ওঠানো-নামানো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এত বড় এলাকা পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের দখলে থাকায় নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিংয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে কার্গো পরিচালনার সক্ষমতা এবং বিমানবন্দরের মূল্যবান জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ভবিষ্যতে শাহজালালে যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়লে অপারেশনাল জায়গার প্রয়োজন আরও বাড়বে। সে বিবেচনায় পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো দ্রুত সরানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একাধিক নোটিশের পর ২০২৪ সালে বাজেয়াপ্ত

বেবিচক সূত্র জানায়, উড়োজাহাজগুলোর Airworthiness Certificate বা উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেগুলোর নিবন্ধনও বাতিল করা হয়।

এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একপর্যায়ে ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজ অপসারণ না করলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রির কথা নোটিশে জানানো হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনি মতামত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি বন্ধক গ্রহণকারী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেয়াপ্ত করে বেবিচক। এ বিষয়ে জাতীয় দৈনিকেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

কেন ভিত্তিমূল্য ছাড়াই আন্তর্জাতিক দরপত্র

উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করার পর নতুন জটিলতা তৈরি হয় এগুলোর মূল্য নির্ধারণ নিয়ে।

আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে এসব উড়োজাহাজের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান দেশে না থাকায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সহযোগিতাও চাওয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিদেশি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়নের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়। তবে এতে যে ব্যয় হতে পারে, উড়োজাহাজগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে সেই অর্থও পুনরুদ্ধার করা যাবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ কারণে আলাদা ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ না করে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাজারের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে মূল্য পাওয়ার প্রস্তাব করেছে বেবিচক।

কর্তৃপক্ষের ধারণা, আন্তর্জাতিক দরপত্রে দেশি-বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিলে প্রতিযোগিতামূলক দর পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সচল বিমান নয়, এখন কার্যত স্ক্র্যাপ

দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় অধিকাংশ উড়োজাহাজের কাঠামো ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরার পাশাপাশি উড়োজাহাজ হিসেবে এগুলোর ব্যবহারযোগ্যতাও নষ্ট হয়েছে।

ফলে এগুলোকে পুনরায় যাত্রীবাহী বা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে স্ক্র্যাপ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ বা ধাতব কাঠামোর উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, এগুলো অপসারণের জন্য ভিত্তিমূল্য ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

আন্তর্জাতিক মানে উড়োজাহাজগুলোর মূল্য নির্ধারণে যে অর্থ ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থও পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় উড়োজাহাজগুলো এখন কার্যত স্ক্র্যাপ বা ভাঙারিযোগ্য ধাতব কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

উড়োজাহাজ সরলে বাড়বে অপারেশনাল সক্ষমতা

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে শাহজালালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী ও কার্গো ফ্লাইট পরিচালিত হয়। ফলে বিমানবন্দরের প্রতিটি অ্যাপ্রোন ও পার্কিং স্পেসের কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

পরিত্যক্ত ১২টি উড়োজাহাজ অপসারণ করা গেলে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট অপারেশনাল এলাকা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।

এতে নতুন উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের জায়গা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্গো ও গ্রাউন্ড অপারেশনের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা সম্পদ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয়েরও সুযোগ তৈরি হবে।

তবে আন্তর্জাতিক দরপত্রের অনুমোদন, দরপত্র আহ্বান, উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং নিরাপদে উড়োজাহাজগুলোর কাঠামো অপসারণ—পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই অ্যাপ্রোনের জায়গা বাস্তবে বিমানবন্দরের নিয়মিত অপারেশনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বোয়িং কিনতে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের প্রশংসা, তারেক র

1

দেশে বসেই টাকায় কেনা যাবে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ

2

ব্রাজিলের দেশীয় ফল থেকে জেট জ্বালানি উৎপাদনে ৩ বিলিয়ন ডলার ব

3

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ২৫ এজেন্সির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বায়রার একাং

4

ডাবলিন বিমানবন্দরে রায়ানএয়ার কর্মীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিয

5

১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে বেবিচকের প্রস্তুতি

6

কালচারাল ট্যুরিজম উন্নয়নে দুই মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা স্মারক স্ব

7

থার্ড টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি, স্ক্যানার ও দক্ষ জনবল নিয়ে

8

বৈরী আবহাওয়া ও জনবল সংকটে নিউইয়র্কের চার বিমানবন্দরে ফ্লাইটে

9

হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে চান? জেনে নিন বুকিং থেকে উড্ডয়ন পর্যন্ত

10

শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি প্রতি

11

আইকাও অডিট সামনে, শাহজালালে এপিবিএনের দায়িত্ব পালনের এসওপি চ

12

দীর্ঘ সময় ফ্লাইট বিলম্ব হলে যাত্রীদের কী সুবিধা দেয় আন্তর্জা

13

মাঝ-আকাশে হঠাৎ ঝাঁকুনি, ৩০০ ফুট নিচে নেমে গেল দিল্লিগামী উড়ো

14

বিদেশগমনেচ্ছুদের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান বোয়েসেলের

15

বাংলাদেশে ভ্রমণে সতর্কতা কমাল যুক্তরাষ্ট্র, উন্নত হলো ট্রাভে

16

শাহজালালে স্ক্যানার অপারেটরদের রেডিয়েশন ঝুঁকি, নিরাপত্তা ব্য

17

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে আগুন, নিরাপদে সরানো

18

রিও ডি জেনেইরোতে পর্যটকবাহী হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৪

19

বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার সেবায় যাত্রা শুরু করল আকিজ গ্রুপ

20