এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে বিপুলসংখ্যক নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ দেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এত বড় বহর পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কতটা প্রস্তুত—সেই প্রশ্ন তুলছেন এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, শুধু নতুন উড়োজাহাজ কিনে বহর বড় করলেই একটি এয়ারলাইন লাভজনক হয় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পাইলট ও প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, শক্তিশালী রুট নেটওয়ার্ক, কার্যকর বিপণন, আর্থিক পরিকল্পনা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা।
এসব প্রস্তুতি ছাড়া দ্রুত বহর সম্প্রসারণ করা হলে নতুন উড়োজাহাজ সম্ভাবনা তৈরির পাশাপাশি বিমানের ওপর বড় আর্থিক চাপও সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বাংলাদেশ বোয়িং থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে নতুন সমঝোতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি চুক্তি করে। এর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকার বলছে, ভবিষ্যৎ যাত্রীচাহিদা এবং বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক চাপের কারণে নেওয়া হয়নি। দেশের ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং এভিয়েশন খাতের সম্প্রসারণ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী এক থেকে দেড় দশকে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে ৭০ থেকে ৮০টি বড় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় ৭৫ শতাংশ যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে পরিবাহিত হচ্ছেন।
ফলে দেশের এয়ারলাইনগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এই বাজারের একটি বড় অংশ নিজেদের নেটওয়ার্কে আনার সুযোগ রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘ সময়েও পুরোপুরি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো অর্জন করতে পারেনি।
তার মতে, বড় বহর পরিচালনার আগে বিমানকে একটি সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক কৌশল তৈরি করতে হবে। তা না হলে নতুন উড়োজাহাজ ভবিষ্যতে সম্পদের পরিবর্তে আর্থিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
একটি নতুন ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর সেটি প্রতিদিন কত ঘণ্টা উড়বে, কোন রুটে চলবে, যাত্রী ও কার্গো থেকে কত রাজস্ব আসবে এবং পরিচালন ব্যয় কত হবে—এসব হিসাব বহর সম্প্রসারণের বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আরেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের অংশীদারত্ব বাড়াতে বহর সম্প্রসারণ প্রয়োজন। তবে নতুন উড়োজাহাজ আসার আগেই প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ প্রস্তুত করতে হবে।
বিশেষ করে নতুন বহরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
একটি উড়োজাহাজ কেনার পর সেটি পরিচালনার জন্য শুধু পাইলট থাকলেই হয় না। টাইপ-রেটেড বৈমানিক, প্রশিক্ষক, প্রকৌশলী, কারিগরি জনবল, খুচরা যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড সাপোর্ট এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও প্রয়োজন।
তার মতে, সফল এয়ারলাইন পরিচালনায় উড়োজাহাজের পাশাপাশি সঠিক বিপণন কৌশল, দক্ষ অপারেশন এবং শক্তিশালী নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর পাশাপাশি আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ এবং ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
এসব পরিকল্পনার বড় অংশ বাস্তবায়িত হলে আগামী বছরগুলোতে বিমানের বহরের আকার বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
তবে ক্রয়, লিজ কিংবা প্রস্তাব বিবেচনাধীন থাকা—তিনটি ভিন্ন পর্যায়। ফলে সব পরিকল্পিত উড়োজাহাজ শেষ পর্যন্ত একইভাবে বহরে যুক্ত হবে—এমনটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
বহর সম্প্রসারণের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—নতুন উড়োজাহাজগুলো কোন রুটে ব্যবহার করবে বিমান?
নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করলেই সেটি লাভজনক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি রুট চালুর আগে সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, গড় টিকিটমূল্য, কার্গো চাহিদা, বিমানবন্দর চার্জ, জ্বালানি ব্যয়, প্রতিযোগী এয়ারলাইন্স এবং ট্রানজিট যাত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বিশেষ করে ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় মাটিতে বসে থাকলে কিংবা কম যাত্রী নিয়ে পরিচালিত হলে এর অর্থনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
ফলে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি রুট ও নেটওয়ার্ক পরিকল্পনাও বহর সম্প্রসারণের কেন্দ্রীয় অংশ হওয়া প্রয়োজন।
সরকার বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলছে। কিন্তু একটি কার্যকর হাব গড়ে তুলতে শুধু বড় জাতীয় এয়ারলাইন বা বেশি উড়োজাহাজ যথেষ্ট নয়।
ঢাকাকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাত্রীদের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা পূর্ব এশিয়ায় পরিবহনের মতো কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হলে ফ্লাইটের সময়সূচি, বিমানবন্দরের সক্ষমতা, দ্রুত ট্রানজিট ব্যবস্থা, ব্যাগেজ ট্রান্সফার এবং প্রতিযোগিতামূলক ভাড়াও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ নতুন উড়োজাহাজ হবে সেই পরিকল্পনার একটি অংশ; পুরো পরিকল্পনা নয়।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান যাত্রীবাজার, বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজের প্রয়োজন রয়েছে—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বড় ধরনের দ্বিমত নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং সেগুলো কীভাবে লাভজনকভাবে পরিচালিত হবে।
হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কেনা নতুন উড়োজাহাজকে পর্যাপ্ত সময় আকাশে রাখতে না পারলে কিংবা লাভজনক রুটে ব্যবহার করা না গেলে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
অন্যদিকে পরিকল্পিতভাবে বহর বাড়িয়ে দক্ষ জনবল, শক্তিশালী MRO ও কারিগরি সক্ষমতা, সঠিক রুট নেটওয়ার্ক এবং পেশাদার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নতুন উড়োজাহাজই বিমানকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
তাই বোয়িংয়ের নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগের সঙ্গে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে—বহর বড় করার পাশাপাশি বিমান কি তার পরিচালন ও বাণিজ্যিক সক্ষমতাকেও একই গতিতে বড় করতে পারবে?
সূত্র: সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
মন্তব্য করুন