এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে সুনামগঞ্জের যুবকদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা দালালচক্রকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। দেশে ও বিদেশে সক্রিয় এ ধরনের দালালদের তথ্য সংগ্রহ করে এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘নিরাপদ অভিবাসন ও অবৈধ পথে বিদেশ গমন প্রতিরোধ’ বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, শুধু বৈধ পথে বিদেশ যাওয়াই নয়, প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অর্জন করে বিদেশে কর্মসংস্থানে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা নিয়ে বিদেশে গেলে কর্মীরা তুলনামূলক ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন।
সুনামগঞ্জের যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
তিনি জানান, সুনামগঞ্জের প্রয়োজনীয় স্থানে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং ভাষা শিক্ষা কোর্স চালুর জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেবে।
বিদেশের শ্রমবাজারে শুধু কর্মীর সংখ্যা নয়, দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রশিক্ষণ এবং গন্তব্য দেশের ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন কর্মীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে শুধু সচেতনতা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত দালালচক্রের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় দেশে ও বিদেশে সক্রিয় অবৈধ দালালদের নাম-ঠিকানাসহ তথ্য সংগ্রহ করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবপাচার বা অবৈধ অভিবাসনে সহায়তার অভিযোগ উঠলেই অবশ্য তা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়। তদন্ত ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নির্ধারিত হবে।
অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারণার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
মসজিদ, মন্দির ও গির্জার ধর্মীয় নেতাদের এ কার্যক্রমে যুক্ত করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার বিপদ এবং বৈধ অভিবাসনের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ থেকেই নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিয়ে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও শক্তিশালীভাবে শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
সভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, বৈধ সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইতালিতে বৈধ কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরির কার্যক্রম চলছে বলে তিনি জানান।
এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে কর্মীদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশ কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সরকারি নোটিশে ২০২৬ সালের জুন-সেপ্টেম্বর সেশনের জন্য ILO Talent Partnership Project-এর আওতাধীন ট্রেড কোর্সের পরীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ৬৯৮ বাংলাদেশি কর্মীকে ইতালির শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ সম্পর্কে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারী অর্থের বিনিময়ে ইতালি যাওয়ার নিশ্চয়তা দিলে সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন যাচাই ছাড়া অর্থ দেওয়া উচিত নয়।
মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী সভায় একটি উপস্থাপনার মাধ্যমে সুনামগঞ্জের যুবকদের অনিয়মিত পথে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা ও এর ঝুঁকি তুলে ধরেন।
সভায় অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বিশেষ করে দালালের মাধ্যমে লিবিয়া গিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের যাত্রায় প্রতারণা, অপহরণ, নির্যাতন, আটক এবং প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।
বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার পর শুধু দালাল বা পরিচিত ব্যক্তির কথার ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন।
চাকরির চুক্তি, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, বেতন ও অন্যান্য সুবিধা, ওয়ার্ক ভিসা, রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা এবং সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব নিশ্চিত হওয়ার পরই অর্থ লেনদেন করা নিরাপদ।
বিশেষ করে ‘ভিজিট ভিসায় আগে যান, পরে ওয়ার্ক পারমিট হবে’, ‘লিবিয়া পৌঁছালে ইউরোপে পাঠানো হবে’ অথবা ‘সাগর পার হলেই চাকরি নিশ্চিত’—এ ধরনের প্রস্তাবকে বড় ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি, সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারসহ প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
সভায় নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দালালচক্র শনাক্ত, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈধ ভিসা, অনুমোদিত নিয়োগ প্রক্রিয়া ও দক্ষতা অর্জন—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ানো সম্ভব।
সূত্র: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট বক্তব্য, সুনামগঞ্জের মতবিনিময় সভা ও প্রকাশিত তথ্য
মন্তব্য করুন