এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত ত্রুটির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বুধবারও দেশটির বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন বিমানবন্দরে ১৫০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবারও যুক্তরাজ্যের বিমানবন্দরগুলোতে ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের ঘটনা ঘটে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম Flightradar24-এর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার নির্ধারিত অন্তত ১৭৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের প্রধান আন্তর্জাতিক গেটওয়ে লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে।
এই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয় যুক্তরাজ্যের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সেবা প্রদানকারী National Air Traffic Services (NATS)-এর ফ্লাইট ডাটা প্রসেসিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর। মূল প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করা হলেও উড়োজাহাজ ও ক্রুদের অবস্থান এবং পরিবর্তিত ফ্লাইট সূচির কারণে পুরো নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে।
NATS জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত সমস্যাটি সমাধানের পরও বিমান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করা একটি জটিল প্রক্রিয়া।
এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে শুধু সংশ্লিষ্ট সময়ের ফ্লাইটগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। একটি উড়োজাহাজ পরবর্তী ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নির্ধারিত বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারলে পরের কয়েকটি ফ্লাইটের সূচিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
একইভাবে পাইলট ও কেবিন ক্রু নির্ধারিত অবস্থানে না থাকা এবং তাদের আইনগত ডিউটি টাইম শেষ হয়ে যাওয়ার মতো কারণে মূল প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের পরও ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্ব অব্যাহত থাকতে পারে।
NATS বলেছে, এটি একটি জটিল পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এবং সমস্যার প্রভাব পুরো বিমান চলাচল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ায় স্বাভাবিক সময়সূচিতে ফিরতে সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সমস্যার কারণে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হাজারো যাত্রী আটকা পড়েছেন। ফ্লাইট বাতিলের পাশাপাশি দীর্ঘ বিলম্বের কারণে অনেক যাত্রীর পরবর্তী সংযোগকারী ফ্লাইট এবং ভ্রমণ পরিকল্পনাও ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষ করে হিথ্রোর মতো বড় আন্তর্জাতিক হাবের ফ্লাইট সূচিতে বিঘ্ন তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগকারী ফ্লাইটেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আইরিশ স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন রায়ানএয়ার জানিয়েছে, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সমস্যার কারণে তাদের ৬৫ হাজারের বেশি যাত্রী বিলম্বসহ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এয়ারলাইনটির দাবি, কিছু ফ্লাইটে বিলম্ব আট ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং ৫০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে।
রায়ানএয়ারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা নিল ম্যাকমোহন NATS-এর কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেছেন, আগেও বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া হলেও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থার সমস্যার কারণে যুক্তরাজ্যের যাত্রী ও এয়ারলাইনগুলো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ঘটনার পর কিছু এয়ারলাইন NATS-এর প্রধান নির্বাহী মার্টিন রলফের পদত্যাগের দাবিও তুলেছে। এটি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলোর দাবি; এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এভিয়েশন বিশ্লেষক জন স্ট্রিকল্যান্ডের মতে, বিমান চলাচল অত্যন্ত সমন্বিত ও সময়নির্ভর একটি ব্যবস্থা। ফলে কয়েক ঘণ্টার প্রযুক্তিগত সমস্যাও দ্রুত পুরো নেটওয়ার্কে বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে।
একটি এয়ারলাইনের একই উড়োজাহাজ ও ক্রু দিনে একাধিক রুটে ব্যবহার করা হয়। প্রথম দিকের একটি ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা বিলম্বিত হলে পরবর্তী ফ্লাইটগুলোর সময়সূচিও একের পর এক পিছিয়ে যেতে পারে।
এটিকে এভিয়েশন নেটওয়ার্কে ‘নক-অন ইফেক্ট’ হিসেবে দেখা হয়। বড় কোনো বিমানবন্দর বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থায় সমস্যা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও এই প্রভাব কাটাতে কয়েক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা Civil Aviation Authority (CAA) জানিয়েছে, NATS-এর কাছ থেকে প্রযুক্তিগত ত্রুটির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হবে।
কী কারণে গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইট ডাটা প্রসেসিং ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল, বিদ্যমান ব্যাকআপ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কোনো প্রযুক্তিগত বা পরিচালনগত পরিবর্তন প্রয়োজন কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
আধুনিক বিমান চলাচলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের ফ্লাইট ডাটা সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজের রুট, উচ্চতা ও অন্যান্য ফ্লাইট তথ্য ব্যবস্থাপনায় এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও কার্যকর ব্যাকআপ সক্ষমতা পুরো এভিয়েশন নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য অপরিহার্য।
যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে, একটি দেশের কেন্দ্রীয় এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থায় কয়েক ঘণ্টার প্রযুক্তিগত বিঘ্নও হাজারো যাত্রী, শত শত ফ্লাইট এবং আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন নেটওয়ার্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: NATS, UK Civil Aviation Authority (CAA), Flightradar24, Ryanair ও প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন
মন্তব্য করুন