এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
মিয়ানমারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগকেন্দ্র মান্দালয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার পর সেখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিমানবন্দরটিকে লক্ষ্য করে একাধিক ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (FPV) ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। এর পর নিরাপত্তা ও অপারেশনাল পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম Global New Light of Myanmar জানিয়েছে, বিমানবন্দরটিকে লক্ষ্য করে মোট ছয়টি FPV ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ হামলার জন্য জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী People's Defence Force (PDF)-কে দায়ী করেছে। তবে সংঘাতের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হামলার পর Myanmar Airways International (MAI) ১০ সেপ্টেম্বর রাতে জানায়, মান্দালয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের সব আন্তর্জাতিক আগমন ও প্রস্থান ফ্লাইট পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। এয়ারলাইনটি এর কারণ হিসেবে ‘operational circumstances’-এর কথা উল্লেখ করেছে।
প্রভাবিত যাত্রীদের পূর্ণ অর্থ ফেরত অথবা আসন খালি থাকা সাপেক্ষে একবার বিনা খরচে রুট পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে MAI। নতুন ফ্লাইট সূচি সম্পর্কে নিজস্ব অফিসিয়াল চ্যানেলে পরবর্তী তথ্য প্রকাশের কথা বলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিতের পাশাপাশি কিছু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের কার্যক্রমও পরিবর্তন করা হয়েছে।
MAI জানিয়েছে, তাদের এবং Mingala Airline-এর কিছু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট PyinOoLwin Township-এর Anisakhan Airport-এ স্থানান্তর করা হবে।
এর ফলে মান্দালয় অঞ্চলের বিমান যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না করে সীমিত আকারে বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করে কিছু অভ্যন্তরীণ সেবা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ড্রোন হামলায় বিমানবন্দরের রানওয়ে, সেখানে অবস্থানরত উড়োজাহাজ কিংবা যানবাহনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি। কোনো হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি।
তবে হামলার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা যাচাই করা প্রয়োজন হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরাসরি রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট স্থগিত বা সীমিত করা হতে পারে।
স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলার সময় বিমানবন্দরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান অবস্থান করছিল এবং সেটিই ড্রোন হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।
তবে হামলাকারীদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সামরিক উড়োজাহাজটিকেই লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানো হয়েছিল—এ তথ্য এখনো নিশ্চিত হিসেবে বলা যাচ্ছে না।
মান্দালয়ের ঘটনা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য ড্রোনের অপব্যবহার কতটা গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেটিও সামনে এনেছে।
বিশেষ করে FPV ড্রোন দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালনা করা সম্ভব। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ড্রোনের উপস্থিতি থাকলে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও কাছাকাছি ড্রোনের উপস্থিতি, বিস্ফোরণের ঝুঁকি কিংবা সামরিক কার্যক্রমের কারণে বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল, ডাইভার্ট বা সাময়িক স্থগিত করতে পারে।
মিয়ানমারে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী ও জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতে ড্রোনের ব্যবহারও বেড়েছে। এর ফলে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মান্দালয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগকেন্দ্র হওয়ায় সেখানে দীর্ঘ সময় ফ্লাইট কার্যক্রম সীমিত থাকলে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনেও প্রভাব পড়তে পারে।
MAI আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দিলেও স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি কবে ফিরবে, তার নির্দিষ্ট সময় জানায়নি। এয়ারলাইনটি জানিয়েছে, পরবর্তী ফ্লাইট সূচি অফিসিয়াল চ্যানেলের মাধ্যমে জানানো হবে।
ফলে মান্দালয় থেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকা যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইনের সর্বশেষ ফ্লাইট স্ট্যাটাস যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে নিশ্চিতভাবে যা জানা যাচ্ছে, তা হলো—ড্রোন হামলার পর মান্দালয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে এবং কিছু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: Reuters, Myanmar Airways International (MAI), Global New Light of Myanmar
মন্তব্য করুন