বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রাজধানীর কাওলা এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হচ্ছে। বেবিচকের নিজস্ব জায়গা থাকা সত্ত্বেও সেখানে কর্মীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ দাবি জানিয়ে আসছেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
কর্মীদের মতে, বেবিচকের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করলেও তাদের জন্য এখনো নিজস্ব ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অথচ কাওলা এলাকায় বেবিচকের এমন জায়গা রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সেখানে একটি আধুনিক Civil Aviation Medical Centre প্রতিষ্ঠা করা হলে শুধু বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীই নয়, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দাবি তোলা হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
কর্মকর্তারা বলেন, বেবিচকের কাজের ধরন অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। দেশের বিমানবন্দর, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, এভিয়েশন সেফটি, সিকিউরিটি, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের শিফট ও জরুরি দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এ কারণে কর্মীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যতম দাবি হলো, কাওলায় সংস্থাটির যে জায়গা খালি রয়েছে, সেখানেই একটি আধুনিক মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা। তাদের মতে, নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন না থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা রয়েছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “বেবিচকের ৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টার নেই। কাওলায় জায়গা থাকা অবস্থায় সেখানে একটি আধুনিক মেডিকেল সেন্টার করা হলে এটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের একটি যৌক্তিক দাবি পূরণ করবে।”
বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কর্মীদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। বিমানবন্দরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন সংস্থার মানুষ দায়িত্ব পালন করেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলে অসুস্থতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ফার্মেসি, জরুরি চিকিৎসা এবং কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ধরনের একটি কেন্দ্র ভবিষ্যতে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কর্মীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, সংস্থাটির সামগ্রিক বাজেট ও আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় একটি আধুনিক মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার ব্যয় খুব বড় হওয়ার কথা নয়। তাদের মতে, এটি কোনো বিলাসী প্রকল্প নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
এক কর্মকর্তা বলেন, “এটা করতে কত টাকা লাগে—সেটা বড় বিষয় নয়। বেবিচকের জন্য এই অর্থ বড় কোনো বিষয় হওয়ার কথা নয়। ৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার করা হলে সেটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হবে।”
তাদের মতে, প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে বহির্বিভাগ, জরুরি চিকিৎসা, প্যাথলজি ও ফার্মেসি চালু করে পরবর্তীতে বিশেষায়িত সেবা যুক্ত করা সম্ভব।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা শুধু আধুনিক অবকাঠামো বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; দক্ষ ও সুস্থ মানবসম্পদও এর অন্যতম ভিত্তি। বেবিচকের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি তাই প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
তাদের দাবি, কাওলায় নিজস্ব জায়গা ব্যবহার করে একটি Civil Aviation Medical Centre প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে একই সঙ্গে কয়েকটি সুবিধা পাওয়া যাবে—জমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি কমবে এবং কর্মীদের জন্য একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো গড়ে উঠবে।
কর্মীদের দীর্ঘদিনের এ দাবির বাস্তবায়নে বেবিচক কর্তৃপক্ষ এখন কী উদ্যোগ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। তাদের প্রত্যাশা, বিষয়টি আর শুধু আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয় নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, কাওলায় জায়গা যখন রয়েছে এবং বেবিচকের ৪ হাজারের বেশি কর্মী যখন নিয়মিত চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন অনুভব করছেন, তখন নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি। এটি কর্মীদের কল্যাণের পাশাপাশি বেবিচকের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেও আরও শক্তিশালী করবে।
মন্তব্য করুন