এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের আকাশপথের প্রধান প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭৫ থেকে ৩০৫টি ফ্লাইট ওঠানামা করছে। একই সঙ্গে বছরে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করছেন ১ কোটি ২৫ লাখের বেশি যাত্রী। ক্রমবর্ধমান এই যাত্রী ও ফ্লাইটের চাপ সামলাতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ফ্লাইটের মধ্যে প্রায় ১৩৫ থেকে ১৫০টি আন্তর্জাতিক, ১৩০ থেকে ১৪০টি অভ্যন্তরীণ এবং ১০ থেকে ১৫টি কার্গো ফ্লাইট রয়েছে।
এই বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট ও যাত্রী বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও অপারেশনাল সমন্বয়ের কাজ এগিয়ে চলছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক যাত্রী ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এই বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাবে, বছরে ১ কোটি ২৫ লাখের বেশি যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করছেন।
যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে চেক-ইন, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং এবং বোর্ডিংসহ প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে।
বিশেষ করে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কাছাকাছি সময়ে অবতরণ বা ছেড়ে যাওয়ার সময় টার্মিনালের বিভিন্ন অংশে যাত্রীর চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
নতুন তৃতীয় টার্মিনালকে এই বাড়তি চাহিদা মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টার্মিনালটিতে স্বয়ংক্রিয় ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা, আধুনিক বোর্ডিং ব্রিজ, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশস্ত যাত্রী লাউঞ্জ এবং অধিকসংখ্যক চেক-ইন কাউন্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে একই সময়ে অধিকসংখ্যক যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
চেক-ইন থেকে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং বোর্ডিং—পুরো যাত্রীযাত্রাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নতুন অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা পেতে শুধু টার্মিনাল ভবন চালু করাই যথেষ্ট নয়। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, নিরাপত্তা, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সিস্টেমের সমন্বিত প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে এই তারিখকে এখনই পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি অপারেশনাল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত। কোন পর্যায়ে কতটি ফ্লাইট নতুন টার্মিনালে স্থানান্তর হবে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে কত সময় লাগবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত অপারেশনাল পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে।
বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম সাধারণত বিভিন্ন সিস্টেম, জনবল ও সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
তৃতীয় টার্মিনালের সাফল্য শেষ পর্যন্ত এর আকার বা আধুনিক স্থাপনার চেয়ে বাস্তবে যাত্রীরা কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন, তার ওপর বেশি নির্ভর করবে।
যাত্রী কত দ্রুত চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন শেষ করতে পারছেন, নিরাপত্তা তল্লাশিতে কত সময় লাগছে, উড়োজাহাজ অবতরণের পর কত দ্রুত ব্যাগেজ পাওয়া যাচ্ছে এবং পুরো যাত্রাপথ কতটা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হচ্ছে—এসবই হবে নতুন টার্মিনালের কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
অর্থাৎ নতুন টার্মিনাল সক্ষমতা তৈরি করবে; সেই সক্ষমতাকে উন্নত যাত্রীসেবায় রূপান্তর করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সঙ্গে দেশের বিমান পরিবহন বাজারও বড় হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ভবিষ্যতে নতুন আন্তর্জাতিক রুট, অধিক ফ্লাইট এবং আরও বেশি যাত্রী ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনাল সেই সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও শুধু একটি আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করলেই কোনো বিমানবন্দর আঞ্চলিক হাবে পরিণত হয় না।
এর জন্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের আগ্রহ, কার্যকর ট্রানজিট সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক বিমানবন্দর চার্জ, দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নির্ভরযোগ্য ব্যাগেজ সেবা, দ্রুত ইমিগ্রেশন এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্কও প্রয়োজন।
এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ফ্লাইট এবং বছরে সোয়া কোটির বেশি যাত্রীর বর্তমান চাপই দেখাচ্ছে—শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা সম্প্রসারণ এখন শুধু ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান বিমান পরিবহন বাজারের বাস্তব প্রয়োজন।
সূত্র: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এভিয়েশন বার্তার বিশ্লেষণ
মন্তব্য করুন