এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক শমশেরনগর বিমানবন্দর আবার বেসামরিক ফ্লাইটের জন্য চালুর দাবি জোরালো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবাসী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বিমানবন্দরটি চালু হলে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—এখানে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা আছে কি না এবং কার্যক্রমটি দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হবে কি না।
সরকারের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। ফলে অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি যাত্রী চাহিদা, সম্ভাব্য রুট, এয়ারলাইন্সের আগ্রহ ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শমশেরনগর বিমানবন্দরের ইতিহাস আট দশকের বেশি পুরোনো।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সরকার প্রায় ৬২২ একর জমির ওপর শমশেরনগর বিমানঘাঁটি নির্মাণ করে। সে সময় সামরিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এখান থেকে ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনীর বিমান বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমার, চীন সীমান্ত এবং জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নিত।
দেশভাগের পর এটি শমশেরনগর বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি পায়। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) এখান থেকে যাত্রীবাহী ফ্লাইটও পরিচালনা করত।
তবে ১৯৬৮ সালের একটি দুর্ঘটনার পর নিয়মিত ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও উড়োজাহাজ সংকটের প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে বিমানবন্দরটি কার্যত পরিত্যক্ত হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে এখানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি ইউনিট স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী স্টেশন শমশেরনগর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শমশেরনগরে বেসামরিক বিমান চলাচল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়।
১৯৯৫ সালে অ্যারো-বেঙ্গল নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার অভাবে সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
বর্তমানে বিমানবন্দর এলাকার একটি অংশ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। রানওয়ের একটি অংশ ও সংলগ্ন কিছু জমি কৃষিকাজ ও মাছচাষেও ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
ফলে নতুন করে বেসামরিক ফ্লাইট চালু করতে হলে শুধু রানওয়ে প্রস্তুত করলেই হবে না। সামরিক ও বেসামরিক কার্যক্রমের সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় টার্মিনাল, নিরাপত্তা, ফায়ার সার্ভিস, নেভিগেশন ও অন্যান্য অপারেশনাল সুবিধার প্রয়োজনীয়তাও মূল্যায়ন করতে হবে।
শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালুর পক্ষে স্থানীয়দের অন্যতম বড় যুক্তি হচ্ছে এই অঞ্চলের পর্যটন ও প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
মৌলভীবাজার ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, হামহাম জলপ্রপাতসহ বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য।
মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও আশপাশের জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রবাসী পরিবারের বসবাসও রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঢাকা থেকে সরাসরি আকাশপথে যোগাযোগ তৈরি হলে পর্যটকদের ভ্রমণের সময় কমবে এবং প্রবাসীদের নিজ এলাকায় যাতায়াত সহজ হবে। এর ফলে হোটেল, পরিবহন, পর্যটন ও অন্যান্য সেবা খাতেও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সম্ভাবনা আর বাস্তব যাত্রী চাহিদা এক বিষয় নয়। বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করতে হলে এসব সম্ভাবনাকে নিয়মিত যাত্রী সংখ্যায় রূপান্তর করা সম্ভব কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর অভিজ্ঞতা শমশেরনগরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যশোর বিমানবন্দরে আগের তুলনায় ফ্লাইট কমে যাওয়ার পাশাপাশি বরিশাল বিমানবন্দরেও যাত্রী চাহিদার কারণে বিভিন্ন সময়ে ফ্লাইট সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
দেশের সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নও অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহনের বাজারে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। স্বল্প দূরত্বের রুটে যাত্রীদের কাছে বিমানভাড়া, বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় এবং সড়কপথের মোট ভ্রমণ সময়—সবকিছুই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে নতুন বা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি বিমানবন্দর চালুর ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় নয়, প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে কত যাত্রী পাওয়া যাবে এবং কতটি ফ্লাইট বাণিজ্যিকভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে—সেটিই মূল প্রশ্ন।
বিমানবন্দর প্রস্তুত থাকলেই সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হয় না।
এয়ারলাইন্সকে একটি রুটে উড়োজাহাজ পরিচালনার আগে সম্ভাব্য যাত্রী সংখ্যা, টিকিটের গড় মূল্য, উড়োজাহাজের আসন পূরণের হার, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় এবং একই উড়োজাহাজ অন্য রুটে ব্যবহার করলে সম্ভাব্য আয়—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
তাই শমশেরনগরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এয়ারলাইন্সগুলোর বাস্তব আগ্রহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিতসংখ্যক ফ্লাইট দিয়ে বাজারের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা সম্ভব কি না, সেটিও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিবেচিত হতে পারে।
শমশেরনগরের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং সেখানে সামরিক কার্যক্রম রয়েছে।
তাই বেসামরিক ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করবে না। সামরিক কার্যক্রম, নিরাপত্তা, আকাশসীমা ব্যবস্থাপনা এবং বেসামরিক অপারেশনের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগে বিমানবন্দরটিতে বেসামরিক ফ্লাইট চালুর বিষয়টি নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—সব মিলিয়ে শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালুর পক্ষে শক্তিশালী সামাজিক ও আঞ্চলিক যুক্তি রয়েছে।
তবে একটি বিমানবন্দরের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করে বাস্তব যাত্রী চাহিদা ও কার্যকর ব্যবসায়িক মডেলের ওপর।
এ কারণে চলমান সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অন্তত যাত্রী চাহিদা, সম্ভাব্য ঢাকা-শমশেরনগর রুট, পর্যটক ও প্রবাসী যাত্রীর বাজার, এয়ারলাইন্সের আগ্রহ, অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয়, সামরিক-বেসামরিক কার্যক্রমের সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসইতা বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এসব সূচকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে ঐতিহাসিক শমশেরনগরে আবার বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের যৌক্তিকতা তৈরি হতে পারে।
আর পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা পাওয়া না গেলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে বিমানবন্দর চালু করা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই নাও হতে পারে।
তাই শমশেরনগরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আবেগ বা ইতিহাসের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফলাফলই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি।
সূত্র: সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য, স্থানীয় সূত্র ও এভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে এভিয়েশন বার্তার বিশ্লেষণ
মন্তব্য করুন