এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের কোনো বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পূর্বানুমোদন ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আর এয়ারলাইন কিংবা এয়ারক্রাফট অপারেটরকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বা অন্যান্য অপারেশনাল সেবা দিতে পারবে না। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক শৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক মানের অপারেশন নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বেবিচক।
সম্প্রতি বেবিচকের ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড রেগুলেশনস বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্টদের (জিএসএ) কাছে পাঠানো হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নয়—এয়ারলাইন ও এয়ারক্রাফট অপারেটরদেরও নিশ্চিত করতে হবে যে তারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বা সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল কাজে কেবল বেবিচক অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকেই নিয়োজিত করছে।
বেবিচকের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে যে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা লাইসেন্স ছাড়াই বিভিন্ন এয়ারলাইন বা এয়ারক্রাফট অপারেটরকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য অপারেশনাল সেবা দিচ্ছে অথবা এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে রাখতে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বা অন্য কোনো অপারেশনাল সেবা দিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম শুরুর আগেই বেবিচকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে হবে।
একই সঙ্গে এয়ারলাইন ও এয়ারক্রাফট অপারেটরদেরও অনুমোদনহীন কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের সেবা না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি উড়োজাহাজ বিমানবন্দরে অবতরণের পর পুনরায় উড্ডয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম গ্রাউন্ড অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত।
এর মধ্যে যাত্রী ও ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, উড়োজাহাজের র্যাম্প কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ধরনের অপারেশনাল সহায়তা থাকতে পারে। এসব কার্যক্রমের একটি অংশ সরাসরি বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপত্তাসংবেদনশীল এলাকায় পরিচালিত হয়।
ফলে এ ধরনের সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের অনুমোদন, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং-সংশ্লিষ্ট সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি কিছু কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল।
একই সময়ে সংরক্ষিত এলাকায় অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ, অন্যের ডিউটি পাস ব্যবহার এবং অনুমতি ছাড়া এয়ারসাইড এলাকায় অবস্থানের মতো কিছু অভিযোগও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি করে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
বেবিচক স্পষ্ট করেছে, নতুন নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হলে তা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১৭ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য এভিয়েশন আইন ও বিধিমালার আওতায় বিবেচনা করা হবে।
লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন, এয়ারক্রাফট অপারেটর, জিএসএ এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ সব পক্ষকে নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি কার্যক্রম। এ কাজে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যথাযথ লাইসেন্স, নিরাপত্তা ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন থাকা অপরিহার্য।
তার মতে, অনুমোদনহীন কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত হলে সেটি শুধু নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘনের বিষয় নয়; বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, যাত্রীসুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি মনে করেন, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না—এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড অপারেশনে একাধিক প্রতিষ্ঠান ও বিপুলসংখ্যক কর্মী যুক্ত থাকেন। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান কোন সেবা দিচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।
বেবিচকের নতুন নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানকে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর অপারেশন থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, এয়ারসাইড নিরাপত্তা এবং গ্রাউন্ড অপারেশনের নিয়ন্ত্রক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি, লাইসেন্স যাচাই এবং বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তার ওপর।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অফিস আদেশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র
মন্তব্য করুন