এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে দেশের এভিয়েশন খাতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আধুনিক উড়োজাহাজের বহর, আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের সুযোগ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রেকর্ড মুনাফা সংস্থাটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।
বিমানের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সম্পদ বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী ও চলতি সম্পদ মিলিয়ে সংস্থাটির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।
এর মধ্যে স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৭১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। শুধু উড়োজাহাজ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের মূল্যই প্রায় ৯ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিমানের সম্পদের বড় অংশই সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা ও এভিয়েশন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এই বিশাল সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সংস্থাটির আয় ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে মোট ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে।
এর মধ্যে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি ৭৮৭-৮, চারটি ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি ৭৩৭-৮০০ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮ রয়েছে।
বিশেষ করে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৭৭-৩০০ইআর-এর মতো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিমানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
বিদ্যমান বহরের কার্যকর ব্যবহার, পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ প্রাপ্যতা এবং সঠিক রুট পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি বিদ্যমান লাভজনক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সম্পদের পাশাপাশি বিমানের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলও ইতিবাচক।
যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমান ৭৮৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। বিমানের তথ্য অনুযায়ী, এটি সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফা।
বিমান কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও গত সাত বছরের মধ্যে চার বছর সংস্থাটি মুনাফা করেছে। একই সময়ে সরকারি কোষাগারে প্রায় ১১০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে বিমান।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ জানিয়েছেন, নিয়মিত পাওনা পরিশোধের মাধ্যমে সংস্থাটির দেনার পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তিও নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে।
তার মতে, বিমানের আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।
বিদ্যমান ১৯ উড়োজাহাজের বহরেই থেমে থাকতে চায় না বিমান। ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বিবেচনায় বড় আকারে বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও চারটি ৭৩৭ ম্যাক্সসহ মোট ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাবও মূল্যায়ন করছে বিমান।
এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিমানের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রুট পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা, প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি এক বিষয় নয়। চূড়ান্ত সংখ্যা, মডেল, মূল্য ও সরবরাহসূচি সংশ্লিষ্ট চুক্তির ওপর নির্ভর করবে।
প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ এবং আধুনিক বহর বিমানের জন্য বড় শক্তি হলেও এ সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি এয়ারলাইন কতটি উড়োজাহাজের মালিক—তার পাশাপাশি প্রতিদিন উড়োজাহাজগুলো কত ঘণ্টা বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে, কোন রুটে ব্যবহার হচ্ছে, আসন থেকে কত আয় হচ্ছে এবং পরিচালন ব্যয় কত—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
কারিগরি কারণে উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় গ্রাউন্ডেড থাকা, দুর্বল রুট পরিকল্পনা কিংবা কম ব্যবহারের কারণে আধুনিক ও মূল্যবান উড়োজাহাজ থেকেও প্রত্যাশিত আয় নাও আসতে পারে।
তাই ফ্লিট ইউটিলাইজেশন, রুট পরিকল্পনা, সময়নিষ্ঠতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বিমানের ভবিষ্যৎ আর্থিক সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আর্থিক সক্ষমতা বাড়লেও যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। স্কাইট্র্যাক্সের মূল্যায়নে বিমান বর্তমানে থ্রি-স্টার এয়ারলাইন হিসেবে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু আধুনিক উড়োজাহাজ দিয়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। টিকিট কেনা থেকে শুরু করে বিমানবন্দর সেবা, কেবিন সার্ভিস, খাবার, সময়নিষ্ঠতা, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবা—পুরো যাত্রাপথের অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ।
পেশাদার ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর রুট পরিকল্পনা এবং যাত্রীসেবায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান সম্পদ থেকেই আরও বেশি বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিমানের সামনে অন্যতম বড় বাজার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা।
সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিদের যাতায়াতের বাজার কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
তবে প্রবাসী যাত্রীদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, সুবিধাজনক সময়সূচি, নির্ভরযোগ্য অপারেশন এবং উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
প্রায় ১৬ হাজার ৯৬১ কোটি টাকার সম্পদ, ১৯ উড়োজাহাজের বহর এবং রেকর্ড ৭৮৫ কোটি টাকা মুনাফা—সব মিলিয়ে বিমানের সামনে সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে সেই সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। তবে বহর বড় করার পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং প্রতিটি নতুন বিনিয়োগ থেকে বাণিজ্যিক সুফল নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
বিমানের সামনে তাই এখন বড় পরীক্ষা—আর্থিক সক্ষমতা ও আধুনিক বহরকে কাজে লাগিয়ে যাত্রীসেবার মান বাড়ানো, লাভজনক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক এভিয়েশন বাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা হিসেবে অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।
সূত্র: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সম্পদ ও আর্থিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য
মন্তব্য করুন