এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
সৌদি আরবে ফাস্টফুডের দোকানে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে ছয় লাখ টাকা নিয়ে এক বাংলাদেশিকে পাচার, আটকে রেখে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে মানবপাচার মামলার এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রোববার (৩১ আগস্ট) দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে সিআইডির মানবপাচার ইউনিট (টিএইচবি) তাকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার ব্যক্তির নাম মো. সালমান হোসেন (৩৩)। তিনি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার শংকরপুর (গাইনপাড়া) এলাকার বাসিন্দা।
সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটি বর্তমানে তাদের মানবপাচার শাখা তদন্ত করছে। চক্রটির অন্য সদস্য এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তেও তদন্ত চলছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে একটি ফাস্টফুডের দোকানে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি চক্র।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে পাঠানোর বিনিময়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের ৭ জুন তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।
কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে চাকরি দেওয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীকে একটি বাসায় আটকে রাখা হয়।
সেখানে আকামা বা বৈধ রেসিডেন্স পারমিট করে দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশে থাকা তার পরিবারের কাছ থেকে আরও অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য ভুক্তভোগীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগও মামলায় করা হয়েছে।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে গ্রেফতার ব্যক্তির সঙ্গে মামলার ঘটনার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। সৌদি আরবে যে বাসায় ভুক্তভোগীকে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে, সেটির সঙ্গেও গ্রেফতার ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। গ্রেফতার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত দায় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, একপর্যায়ে ভুক্তভোগী কৌশলে ওই বাসা থেকে পালাতে সক্ষম হন।
পরে একটি মরুভূমি এলাকায় গিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির আশ্রয় নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সৌদি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দেশে ফেরার পর ঘটনার বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্ত্রী বাদী হয়ে ঢাকার সাভার থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করেন।
পরবর্তী সময়ে মামলাটির তদন্তভার সিআইডির মানবপাচার শাখা গ্রহণ করে।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় ৩১ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে সালমান হোসেনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে সিআইডি।
সিআইডি জানিয়েছে, শুধু একজনকে গ্রেফতারের মধ্যেই তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না।
চক্রটির অন্য সদস্য কারা, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবে তাদের সহযোগী রয়েছে কি না এবং একই প্রক্রিয়ায় আরও বাংলাদেশি প্রতারণা বা মানবপাচারের শিকার হয়েছেন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে ব্যবহৃত অন্যান্য তথ্যও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ভিসা দেখেই অর্থ প্রদান করা নিরাপদ নয়। ভিসাটি কোন শ্রেণির, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কে, নির্ধারিত কাজ কী, বেতন কত এবং কর্মীর নামে বৈধ কর্মসংস্থান চুক্তি রয়েছে কি না—এসবও যাচাই করা প্রয়োজন।
সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আকামা, নিয়োগকর্তা এবং কাজের বৈধ অবস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ‘সৌদিতে পৌঁছানোর পর আকামা করে দেওয়া হবে’ কিংবা ‘আগে যান, পরে চাকরি ঠিক করে দেওয়া হবে’—এ ধরনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে।
রিক্রুটিং এজেন্সির সরকারি অনুমোদন, চাকরির চুক্তিপত্র, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা, ভিসার ধরন এবং বিদেশে যাওয়ার সরকারি ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ পরিশোধ করলে অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় রসিদ সংগ্রহ করাও জরুরি।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশে যাওয়ার আগে বা গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর কেউ পাসপোর্ট জিম্মি করলে, চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো স্থানে আটকে রাখলে দ্রুত সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে ভিসা জালিয়াতি, মানবপাচার বা অনিয়মিত অভিবাসনের সন্দেহ হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সিআইডিকে বিষয়টি জানানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিদেশে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের প্রলোভনকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ঝুঁকি থাকায় কর্মীদের সরকার অনুমোদিত বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং যাচাই ছাড়া কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর হাতে টাকা-পাসপোর্ট না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্র
মন্তব্য করুন