এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সরাসরি আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগের আওতায় আনতে বিমানবন্দরটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন এগিয়ে চলছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করতে যাত্রী টার্মিনাল থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রানওয়ে সম্প্রসারণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দর দেশের অন্যতম ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর। প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট এখানে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে পর্যটক ও অন্যান্য যাত্রীর উচ্চ চাহিদার কারণে বিমানবন্দরটির গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরে আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল সুবিধা, বোর্ডিং ব্রিজ, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন সুবিধা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় একসঙ্গে প্রায় ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ধারণক্ষমতার প্রস্থান লাউঞ্জ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমনের জন্য ইমিগ্রেশনসহ প্রয়োজনীয় যাত্রীসেবা অবকাঠামো রাখা হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক সক্ষমতায় উন্নীত করার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি রানওয়ে সম্প্রসারণ।
আগে বিমানবন্দরটির রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৯ হাজার ফুট। সমুদ্রের দিকে আরও প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে।
সমুদ্রের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণের এই প্রকল্প কক্সবাজার বিমানবন্দরকে দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় আলাদা পরিচিতিও দিয়েছে।
দীর্ঘ রানওয়ের কারণে তুলনামূলক বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার অবকাঠামোগত সক্ষমতা বেড়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের বড় উড়োজাহাজ নিয়মিত পরিচালনা করা যাবে কি না, সেটি শুধু রানওয়ের দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে না।
রানওয়ের শক্তিমাত্রা, এপ্রোন ও ট্যাক্সিওয়ের সক্ষমতা, নেভিগেশন সুবিধা, ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অপারেশনাল অনুমোদনও এর সঙ্গে যুক্ত।
আধুনিক টার্মিনাল এবং দীর্ঘ রানওয়ে তৈরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও শুধু অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু করা যায় না।
এর সঙ্গে কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক যাত্রী ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ একাধিক কার্যক্রমের সমন্বয় প্রয়োজন।
এরপর আসে এয়ারলাইনসের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত। সম্ভাব্য কোনো আন্তর্জাতিক রুটে কত যাত্রী পাওয়া যাবে, পরিচালন ব্যয় কত হবে, উড়োজাহাজ পাওয়া যাবে কি না এবং রুটটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে কি না—এসব বিবেচনা করেই এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফলে কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতির পাশাপাশি পুরো অপারেশনাল ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। কিন্তু বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের বড় অংশকে বর্তমানে প্রথমে ঢাকায় এসে পরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট অথবা সড়কপথে কক্সবাজার যেতে হয়।
সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে এই চিত্রে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
বিদেশি পর্যটক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ ঢাকা হয়ে না গিয়ে সরাসরি কক্সবাজারে পৌঁছাতে পারবেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর সঙ্গে আকাশ যোগাযোগ তৈরি হলে কক্সবাজারের পর্যটন খাত নতুন আন্তর্জাতিক বাজার পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
এর সুফল শুধু বিমানবন্দরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়লে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, ট্যুর অপারেটর এবং পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসায় নতুন চাহিদা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ একটি পর্যটন শহরের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যটকদের ব্যয় স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, পরিবহন, হসপিটালিটি ও অন্যান্য সেবার চাহিদাও বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়লে বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিভিন্ন ফি এবং সেবা থেকেও রাজস্বের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক রুটের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া, প্রতিযোগিতামূলক বিমানভাড়া, এয়ারলাইনসের আগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের উপযোগী সামগ্রিক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। তবে যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক রুট ও নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
কোন এয়ারলাইন প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে, কোন গন্তব্যে যাবে, কবে থেকে নিয়মিত ফ্লাইট শুরু হবে এবং টিকিট বিক্রি কখন শুরু হবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইনসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সম্ভাব্য কোনো রুট বা উদ্বোধনের তারিখকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিয়মিত ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হলে কক্সবাজারের পরিচয় আর শুধু দেশের অন্যতম ব্যস্ত পর্যটন বিমানবন্দরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন আকাশদ্বার।
সূত্র: কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট প্রস্তুতিসংক্রান্ত তথ্য
মন্তব্য করুন