ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী এ খাতে বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (WTTC) সর্বশেষ ‘Global Trends Report’-এ এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে বৈশ্বিক জিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান রেকর্ড ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষের ভ্রমণ চাহিদা এবং পর্যটন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ অব্যাহত থাকার বিষয়টি এ প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
WTTC-এর তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন খাতে বিনিয়োগে নেতৃত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও সৌদি আরব।
২০২৫ সালে চার দেশ সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার পর্যটন-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ করেছে, যা বৈশ্বিক পর্যটন খাতের মোট মূলধনী বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক।
নতুন বিমানবন্দর ও টার্মিনাল, হোটেল-রিসোর্ট, পর্যটন গন্তব্য, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বিনোদন অবকাঠামো এবং পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সেবা সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে এসব দেশ।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ পর্যটনকে শুধু অবকাশযাপনের খাত হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণের কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করছে।
WTTC-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
পর্যটনের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু হোটেল বা ট্যুর অপারেটরের আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, বিনোদন, খুচরা ব্যবসা এবং স্থানীয় সেবা খাতের বড় অংশও পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা এবং তাদের ব্যয় বাড়লে এর অর্থনৈতিক প্রভাব একাধিক খাতে ছড়িয়ে পড়ে।
WTTC-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গ্লোরিয়া গুয়েভারা পর্যটন গন্তব্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এ খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
পর্যটনে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ।
কোনো পর্যটন গন্তব্যে সহজে পৌঁছানো না গেলে শুধু আকর্ষণীয় পর্যটন সম্পদ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। এ কারণে বিমানবন্দর সক্ষমতা, সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক বিমানভাড়া এবং সহজ ট্রানজিট সুবিধা পর্যটন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একইভাবে কোনো গন্তব্যে পর্যটকের চাহিদা বাড়লে এয়ারলাইনসের জন্য নতুন রুট বা অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
এ কারণে বিশ্বের বড় পর্যটন অর্থনীতিগুলো পর্যটন অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমান যোগাযোগেও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে।
WTTC-এর প্রতিবেদনে ইউরোপের অন্যতম সফল পর্যটন বাজার হিসেবে স্পেনের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে আগামী এক দশকে ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস, রুয়ান্ডা, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে সংস্থাটি।
এই বাজারগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শুধু পর্যটন আকর্ষণ থাকাই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, সহজ ভিসা ব্যবস্থা, মানসম্মত অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রচারণা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সুপরিকল্পিত গন্তব্য ব্যবস্থাপনাও পর্যটন প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী এক দশকেও পর্যটন শিল্পের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে WTTC।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান ১৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
একই সময়ে এ খাত বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে এগুলো পূর্বাভাস, নিশ্চিত ফলাফল নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানির মূল্য, বিমানভাড়া, ভিসানীতি এবং বিভিন্ন দেশের পর্যটন ও বিনিয়োগ নীতির ওপর প্রকৃত প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে।
বিশ্ব পর্যটনে বিনিয়োগ বৃদ্ধির এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর, দ্বীপ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাসহ বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্পদ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে এসব গন্তব্যের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, বিমানবন্দর থেকে পর্যটন গন্তব্যে সহজ যাতায়াত, মানসম্মত আবাসন, নিরাপত্তা, ডিজিটাল বুকিং ও পেমেন্ট সুবিধা, দক্ষ পর্যটনকর্মী এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণায় বিনিয়োগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পর্যটন প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন পর্যটনকে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে বড় বিনিয়োগ করছে, তখন বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট পর্যটন নীতি, সহজ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, উন্নত বিমান যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী ‘Destination Bangladesh’ ব্র্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
WTTC-এর দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দশকেও বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে থাকবে ভ্রমণ ও পর্যটন।
এই সম্প্রসারণের সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তা নির্ভর করবে পর্যটন সম্পদ থাকার চেয়ে বেশি—সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, বিমান যোগাযোগ, সেবার মান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশকে কার্যকরভাবে তুলে ধরার সক্ষমতার ওপর।
সূত্র: World Travel & Tourism Council (WTTC)
মন্তব্য করুন