এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সরকার ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে উকিল নোটিস পাঠানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার সোমবার জনস্বার্থে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এ নোটিস পাঠান।
নোটিসটি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তির খবর প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবিত বহরে আটটি Boeing 787-10, দুটি Boeing 787-9 এবং চারটি Boeing 737 MAX থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসব উড়োজাহাজের সম্মিলিত তালিকামূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উড়োজাহাজের তালিকামূল্য এবং কোনো এয়ারলাইন্সের প্রকৃত ক্রয়মূল্য এক নাও হতে পারে। বড় আকারের উড়োজাহাজ ক্রয়ে নির্মাতা ও ক্রেতার মধ্যে বাণিজ্যিক সমঝোতা, কনফিগারেশন, ইঞ্জিন, সহায়ক সেবা এবং অন্যান্য শর্তের ভিত্তিতে প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হতে পারে।
উকিল নোটিসে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এত বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের আগে উন্মুক্ত দরপত্র, প্রতিযোগিতা এবং প্রযোজ্য সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
তবে নোটিসে প্রশ্ন উত্থাপন বা তথ্য চাওয়ার অর্থ ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।
নোটিসে বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসসহ অন্যান্য সম্ভাব্য সরবরাহকারীর প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন নির্মাতাকে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশের দাবি রয়েছে।
নোটিসদাতা আইনজীবীর বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এত বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সুফল এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাবও মূল্যায়ন করা উচিত।
উকিল নোটিসে উড়োজাহাজ ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি, সম্ভাব্যতা যাচাই, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়সংক্রান্ত ফাইল, সভার কার্যবিবরণী, সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংরক্ষণের দাবিও করা হয়েছে।
নোটিসে বলা হয়েছে, একজন নাগরিক ও করদাতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে সে বিষয়ে জনগণের তথ্য জানার অধিকার রয়েছে।
নোটিসে শুধু ক্রয়পদ্ধতি নয়, বিমানের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিষয়টিও সামনে আনা হয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজ কেনার আগে বিমানের প্রকৃত বহর-চাহিদা, বিভিন্ন রুটে যাত্রীর সংখ্যা, লোড ফ্যাক্টর, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারের পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আর্থিক সুফল বিশ্লেষণের দাবি জানানো হয়েছে।
কারণ নতুন উড়োজাহাজ কেনার ব্যয় শুধু প্রাথমিক ক্রয়মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, খুচরা যন্ত্রাংশ, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও যুক্ত থাকে।
ফলে বড় বহর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজগুলো কোন রুটে ব্যবহার করা হবে এবং সেগুলো থেকে পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক আয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
উকিল নোটিসে বড় অঙ্কের উড়োজাহাজ ক্রয়ের Opportunity Cost বা সুযোগ ব্যয় বিশ্লেষণের দাবিও জানানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি ব্যয়, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন, খেলাপি ঋণ এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে সরকারি অর্থের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবীর বক্তব্য, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
উকিল নোটিসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন কোনো চুক্তি কার্যকর করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিসে সতর্ক করা হয়েছে।
এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নোটিসটির কী জবাব দেয় এবং ১৪ উড়োজাহাজের ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে কী তথ্য প্রকাশ করে, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র: ব্যারিস্টার মোস্তফা মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ারের পাঠানো উকিল নোটিস ও সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্য
মন্তব্য করুন