এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দুবাই থেকে ইস্তাম্বুলগামী এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে মাঝ আকাশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন যাত্রীরা। উড়োজাহাজের কেবিনের ছাদ থেকে হঠাৎ পানি পড়তে শুরু করলে কয়েকটি আসন ও আশপাশের এলাকা ভিজে যায়। পানি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে যাত্রীদের কেউ কেউ কম্বল মাথার ওপর ধরে বসে থাকেন। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এমিরেটসের দুবাই-ইস্তাম্বুল ফ্লাইট EK123-এ। প্রথমে যাত্রীদের কাছে পানির উৎস স্পষ্ট না হলেও পরে এমিরেটস জানিয়েছে, কেবিনের একটি অংশে জমে থাকা ঘনীভূত জল বা ‘কনডেনসেশন’ থেকে পানি পড়েছিল।
এক যাত্রীর ধারণ করা ভিডিওতে উড়োজাহাজের কেবিনের ওপরের প্যানেল থেকে একাধিক ধারায় পানি নিচে পড়তে দেখা যায়। কয়েকজন যাত্রী পানি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কম্বল ব্যবহার করেন। আবার কেউ মোবাইল ফোনে ঘটনাটি ধারণ করেন।
তাইওয়ানের যাত্রী সিন ইং চ্যাংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ তার ওপর অনেকটা ‘ঝরনার মতো’ পানি পড়তে শুরু করে। এতে তার আসন ও আশপাশের অংশ ভিজে যায়।
ঘটনার সময় পানির উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় যাত্রীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়।
ঘটনার পর এমিরেটস আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ফ্লাইটটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর কেবিনের একটি অংশে জমে থাকা condensation-এর কারণে পানি দেখা যায়।
এয়ারলাইনটির ভাষ্য অনুযায়ী, কেবিন ক্রুরা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। যেসব যাত্রীর আসন ভিজে গিয়েছিল, তাদের অন্য আসনে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এমিরেটস আরও জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে ফ্লাইটে নতুন করে পানি পড়ার ঘটনা ঘটেনি এবং উড়োজাহাজটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখে।
ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে এয়ারলাইনটি।
তবে ঘটনার সময় যাত্রীসেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিন ইং চ্যাং। তার দাবি, তাকে যে স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেখানে টিভি বা স্বাভাবিক ইন-ফ্লাইট বিনোদন সুবিধা ছিল না।
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় কেবিন ক্রুদের কাছ থেকে পানির কারণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা পাননি।
তবে যাত্রীর এই অভিযোগের বিপরীতে এমিরেটস বলেছে, ক্রুরা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং ভেজা আসনের যাত্রীদের স্থানান্তর করেছেন।
উড়োজাহাজের ছাদ থেকে পানি পড়ার দৃশ্য দেখলে অনেকের কাছে সেটিকে পাইপ বা অন্য কোনো ব্যবস্থার বড় ধরনের লিক মনে হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য উড়োজাহাজের কাঠামোগত ত্রুটি বা গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার নির্দেশ করে না।
উড়োজাহাজের ভেতরের উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা কোনো পৃষ্ঠের সংস্পর্শে এলে জলীয় বাষ্প ছোট ছোট পানির ফোঁটায় পরিণত হতে পারে। এই প্রক্রিয়াই condensation বা ঘনীভবন।
কিছু পরিস্থিতিতে সেই পানি কেবিনের ওপরের প্যানেলের আশপাশে জমে পরে নিচে পড়তে পারে।
এমিরেটস এই নির্দিষ্ট ঘটনায় কেবিনের একটি অংশে condensation জমে যাওয়াকেই পানির উৎস হিসেবে জানিয়েছে। ফলে ভাইরাল ভিডিওর দৃশ্য নাটকীয় হলেও এয়ারলাইনটি ঘটনাটিকে উড়োজাহাজের বড় ধরনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি হিসেবে বর্ণনা করেনি।
ঘটনার পরও ফ্লাইট EK123-এর যাত্রা বাতিল কিংবা জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হয়নি।
ফ্লাইটটি দুবাই থেকে স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ১৪ মিনিটে যাত্রা শুরু করে এবং চার ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
এমিরেটসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক ঘটনার পর ফ্লাইটের বাকি সময়ে আর পানি পড়তে দেখা যায়নি।
এ ঘটনায় কোনো যাত্রীর আহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।
ফ্লাইট চলাকালে কেবিনে পানি, ধোঁয়া, অস্বাভাবিক গন্ধ কিংবা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত উৎস শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ধরনের দৃশ্যের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
কেবিন ক্রুরা সাধারণত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আসন খালি করা এবং ককপিট ক্রুদের বিষয়টি জানানোর মতো পদক্ষেপ নেন। যাত্রী নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিই এ ধরনের ঘটনায় প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
EK123-এর ক্ষেত্রে এমিরেটস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের আসন পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফ্লাইট স্বাভাবিকভাবেই গন্তব্যে পৌঁছায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কেবিনের ছাদ থেকে পানি পড়ার দৃশ্যটি অস্বাভাবিক হওয়ায় দ্রুত মানুষের নজর কেড়েছে। তবে শুধু ভিডিও দেখে উড়োজাহাজের কারিগরি নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
এ ধরনের ঘটনায় পানির উৎস, উড়োজাহাজের সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের অবস্থা এবং ফ্লাইট ক্রু ও প্রকৌশলীদের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
এমিরেটসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি কেবিনে জমে থাকা condensation-এর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল এবং পরবর্তী সময়ে আর পানি দেখা যায়নি।
তবে যাত্রীসেবার দৃষ্টিকোণ থেকে মাঝ আকাশে যাত্রীর আসন ভিজে যাওয়া এবং তাকে অন্য আসনে স্থানান্তর করতে হওয়া নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। এ কারণেই এমিরেটস ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
সূত্র: এমিরেটস, Viral Press ও Fox News
মন্তব্য করুন