এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
মালয়েশিয়ার স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা AirAsia Group আন্তর্জাতিক ঋণবাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং স্থানীয় ক্রেডিট সুবিধার মাধ্যমে আরও ৭০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ অর্থ শুধু পরিচালন ঘাটতি পূরণের জন্য নয়; AirAsia বলছে, এর মূল লক্ষ্য বিদ্যমান ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃঅর্থায়ন এবং ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করা।
এদিকে এয়ারলাইনটির আর্থিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় AirAsia-এর অর্থায়নের প্রয়োজন পর্যালোচনায় Alton Aviation Consultancy-কে নিয়োগ দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার নতুন ঋণের গ্যারান্টি দেবে বা সরাসরি বেইলআউট করবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
AirAsia জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলার এবং স্থানীয়ভাবে ৭০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত সংগ্রহের পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য হলো একাধিক বিদ্যমান ঋণকে তুলনামূলক কম ব্যয়, দীর্ঘ মেয়াদ এবং উন্নত শর্তের একটি কাঠামোয় নিয়ে আসা।
এয়ারলাইনটি এর আগে ২০২৬ সালের মার্চে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, সেই অর্থও ঋণের মেয়াদ বাড়ানো ও মূল ঋণের দায় কমাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন তহবিল সংগ্রহকে সরাসরি ‘পরিচালন ব্যয় চালানোর জন্য জরুরি অর্থ’ হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে AirAsia এটিকে বৃহত্তর debt refinancing ও capital structure optimisation পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
AirAsia-এর সর্বশেষ আর্থিক ফলাফলে চাপের বিষয়টি স্পষ্ট। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গ্রুপটির মোট নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ৮৩০.৫ মিলিয়ন রিঙ্গিত। এর মধ্যে মূল প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য attributable net loss ছিল ৫২৭.১৬ মিলিয়ন রিঙ্গিত।
এই দুটি হিসাবের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীতে ৫২৭.১৬ মিলিয়ন রিঙ্গিতের অঙ্কটি থাকলেও এটিকে পুরো AirAsia Group-এর মোট দ্বিতীয় প্রান্তিকের নিট লোকসান বলা সঠিক হবে না।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে গড় জেট ফুয়েলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামার কারণে প্রায় ৩৩১ মিলিয়ন রিঙ্গিতের ফরেক্স লোকসান হয়। ফরেক্স প্রভাব বাদ দিলে দ্বিতীয় প্রান্তিকের নিট লোকসান প্রায় ৪৯৯.৬ মিলিয়ন রিঙ্গিত হতো।
৩০ জুন পর্যন্ত AirAsia-এর হাতে নগদ ও ব্যাংক ব্যালান্স ছিল প্রায় ৯৫৪ মিলিয়ন রিঙ্গিত, যেখানে চলতি দায় ছিল প্রায় ১৮.৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত।
এ ছাড়া প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রুপটির ঋণ ছিল প্রায় ৩.১৩ বিলিয়ন রিঙ্গিত এবং লিজ দায় ছিল প্রায় ১৩.৩ বিলিয়ন রিঙ্গিত।
এই আর্থিক অবস্থাই কেন AirAsia ঋণের মেয়াদ বাড়ানো, ব্যয়বহুল ঋণ পুনঃঅর্থায়ন এবং ব্যালান্সশিট পুনর্গঠনে গুরুত্ব দিচ্ছে—তার একটি বড় কারণ।
Reuters-কে দুটি সূত্র জানিয়েছে, AirAsia-এর আর্থিক পুনর্গঠন ও পুনঃমূলধনীকরণের জন্য শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩ বিলিয়ন ডলার নতুন মূলধনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি AirAsia-এর আনুষ্ঠানিক তহবিল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা নয়; সংশ্লিষ্ট সূত্রের একটি অনুমান।
অন্যদিকে AirAsia সহপ্রতিষ্ঠাতা টনি ফার্নান্দেস বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির তারল্য শক্তিশালী এবং সরকারি বেইলআউট চাওয়া হয়নি। তাঁর মতে, বর্তমানে যে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে, তার বড় অংশই ঋণ পুনঃঅর্থায়নের জন্য।
ফলে AirAsia-এর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাজারে উদ্বেগ থাকলেও কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার AirAsia-এর অর্থায়ন প্রয়োজন মূল্যায়ন করলেও বর্তমানে সরকারি বেইলআউট বা ঋণ গ্যারান্টির কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি সহায়তার সম্ভাব্য ধরন কী হতে পারে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে সরকারি গ্যারান্টির বিনিময়ে পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধিত্ব বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট শর্ত থাকবে—এমন বিষয়কে এখনই নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
এর আগে ২০২১ সালে AirAsia-এর জন্য একটি সরকার-সমর্থিত ঋণের উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
AirAsia-এর আর্থিক পরিস্থিতি মালয়েশিয়া সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ দেশটির বিমান পরিবহন বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বড় উপস্থিতি।
Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, AirAsia মালয়েশিয়ার সামগ্রিক বিমান পরিবহন বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করে।
ফলে AirAsia-এর কার্যক্রমে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে শুধু একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সমস্যায় বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে না; অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ, পর্যটন, কর্মসংস্থান, টিকিটের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং Kuala Lumpur International Airport-এর আঞ্চলিক সংযোগেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই মালয়েশিয়া সরকার সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় Malaysia Airlines ও Batik Air-এর সঙ্গেও আলোচনা করেছে বলে Reuters জানিয়েছে। তবে দুটি এয়ারলাইনই AirAsia-এর কার্যক্রম সরাসরি অধিগ্রহণের পরিবর্তে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী স্বাভাবিক সম্প্রসারণে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে।
AirAsia-এর জন্য নতুন অর্থায়ন সফল হলে বিদ্যমান ঋণের চাপ পুনর্বিন্যাস এবং ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য, রুটের লাভজনকতা, ঋণের শর্ত এবং যাত্রী চাহিদার ওপর।
ইতোমধ্যে AirAsia কম লাভজনক কিছু রুট কমানো, পুরোনো উড়োজাহাজ ফেরত দেওয়া এবং বিভিন্ন সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিন্যাসের মতো ব্যয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার স্বল্পপাল্লার কার্যক্রম দ্বিতীয় প্রান্তিকেও লাভজনক ছিল।
ফলে AirAsia-এর বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘বেইলআউটের অপেক্ষায় থাকা এয়ারলাইন’ হিসেবে দেখার চেয়ে বড় ধরনের ঋণ পুনর্গঠন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়িক পুনর্বিন্যাসের পর্যায় হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ। সরকারি সহায়তা শেষ পর্যন্ত দেওয়া হবে কি না এবং হলে কী কাঠামোয় দেওয়া হবে—সেটিই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র: AirAsia Group, Reuters, Bursa Malaysia ও Bernama
মন্তব্য করুন