এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের আকামা বা রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার। কোনো বাংলাদেশি কর্মীর বর্তমান নিয়োগকর্তা বা কফিল আকামা নবায়ন না করলে, সংশ্লিষ্ট কর্মী সৌদি আরবের প্রচলিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে আকামা নবায়নের সুযোগ পাবেন বলে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সৌদি আরবের মানবসম্পদবিষয়ক উপমন্ত্রী মুহান্নাদ বিন আহমেদ আল-ঈসার বৈঠকে বিষয়টি জানানো হয়।
বৈঠকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রবিষয়ক কনস্যুলার উপমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ এ. এম. আলশামেরি উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট ও আকামা দ্রুত ইস্যু ও নবায়নের বিষয়টি সৌদি প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরে বাংলাদেশ।
বিশেষ করে কিছু নিয়োগকর্তা অতিরিক্ত ফি বা অন্যান্য কারণ দেখিয়ে কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট ও আকামা নবায়নে বিলম্ব করছেন—এমন সমস্যার সমাধানে সৌদি সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
জবাবে সৌদি পক্ষ জানায়, কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মূল নিয়োগকর্তা আকামা নবায়ন না করলে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে আকামা নবায়নের সুযোগ থাকবে এবং এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা থাকবে না।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে সৌদি আরবের শ্রম ও অভিবাসন ব্যবস্থার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
নতুন তথ্যটি সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অর্থ এই নয় যে একজন কর্মী কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো নিয়োগকর্তার অধীনে চলে যেতে পারবেন।
আকামা, ওয়ার্ক পারমিট এবং নিয়োগকর্তা পরিবর্তন সৌদি আরবের শ্রম ও অভিবাসনসংক্রান্ত নিয়মের আওতাধীন।
তাই বর্তমান নিয়োগকর্তা আকামা নবায়ন না করলে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীকে অর্থ দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘কফিল পরিবর্তন’ করার পরিবর্তে সৌদি সরকারের অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে সৌদি মানবসম্পদবিষয়ক উপমন্ত্রী জানান, দেশটি বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগে আগ্রহী।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও হসপিটালিটি খাতে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ জন্য দুই দেশের কারিগরি ও পেশাগত যোগ্যতার পারস্পরিক স্বীকৃতির একটি কাঠামো তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ধরনের ব্যবস্থা তৈরি হলে বাংলাদেশে অর্জিত নির্দিষ্ট কারিগরি ও পেশাগত যোগ্যতা সৌদি শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কোন পেশা বা সনদ এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে এবং কবে থেকে তা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পরই পরিষ্কার হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে একটি সৌদি-বাংলাদেশ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য কর্মীদের শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এর মধ্যে থাকবে আরবি ভাষা, সৌদি আইন, স্থানীয় সংস্কৃতি, কর্মপরিবেশ এবং প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন।
এ ধরনের প্রশিক্ষণ বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরবে যাওয়ার আগেই কর্মীরা কর্মস্থলের নিয়ম, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে কেন্দ্রটি এখনো একটি প্রস্তাব। এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে বা প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন নেওয়া হচ্ছে—এমন ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
দুই দেশের জনশক্তি সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবকে গৃহকর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছে।
পাশাপাশি SVP চুক্তি নবায়ন এবং সম্প্রতি চূড়ান্ত হওয়া নতুন কর্মী নিয়োগ চুক্তিতে সৌদি সরকারের দ্রুত অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জনশক্তি নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিয়ে নিয়মিত আলোচনার জন্য দুই দেশের যৌথ টেকনিক্যাল কমিশনের সভা আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সৌদি প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, দেশটিতে বিদেশি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় Wage Protection System (WPS) এবং Insurance সুবিধা কার্যকর রয়েছে।
Wage Protection System-এর উদ্দেশ্য হলো কর্মীদের বেতন পরিশোধের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করা।
তবে কোনো কর্মী বেতন না পাওয়া, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ বা কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অন্য সমস্যায় পড়লে শুধু অনানুষ্ঠানিকভাবে সমাধানের চেষ্টা না করে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট সরকারি শ্রমব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ মিশনের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আকামা সৌদি আরবে একজন বিদেশি কর্মীর বৈধ অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। ফলে নিয়োগকর্তা সময়মতো আকামা বা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের ব্যবস্থা না করলে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়।
বর্তমান নিয়োগকর্তা নবায়নে অস্বীকৃতি জানালে বা অস্বাভাবিক বিলম্ব করলে কর্মীদের প্রথমেই নিজের কর্মসংস্থান ও আকামার অবস্থা সরকারি ব্যবস্থায় যাচাই করা উচিত।
অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে আকামা নবায়নের সুযোগ সম্পর্কে প্রয়োজনে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অথবা বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের কাছ থেকে সঠিক প্রক্রিয়া জেনে নেওয়া নিরাপদ।
বিশেষ করে ‘কফিল ছাড়াই আকামা’, ‘টাকার বিনিময়ে তাৎক্ষণিক কফিল পরিবর্তন’ কিংবা ‘সরকারি অনুমোদন ছাড়াই নতুন আকামা’ করে দেওয়ার প্রস্তাব পেলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বৈঠকে সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়টিও উঠে আসে।
সৌদি প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, আটক বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় তথ্য কূটনৈতিক মাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে সাধারণ ক্ষমতার আওতায় তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
তবে এটি সব আটক বাংলাদেশির স্বয়ংক্রিয় মুক্তির ঘোষণা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মামলা, আইনি অবস্থা এবং সৌদি আরবের প্রযোজ্য নিয়মের ভিত্তিতে প্রতিটি বিষয় বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের বৈঠকে আকামা নবায়ন থেকে শুরু করে নতুন কর্মী নিয়োগ, দক্ষতা স্বীকৃতি, প্রশিক্ষণ এবং প্রবাসী কর্মীদের অধিকার—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে।
এর মধ্যে বর্তমান নিয়োগকর্তা আকামা নবায়ন না করলে বৈধ প্রক্রিয়ায় অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে নবায়নের সুযোগের বিষয়টি সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সুযোগ নিতে অবশ্যই সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক শ্রম ও অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সূত্র: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ-সৌদি আরব বৈঠকের তথ্য
মন্তব্য করুন