এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে দায়িত্ব পেতে ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মেনজিস এভিয়েশন। দায়িত্ব পেলে প্রথম বছরেই এক হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আধুনিক গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট স্থাপন এবং বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনাকে সামনে রেখে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি দ্বিতীয় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে দায়িত্ব পেতে মেনজিস এভিয়েশন ছাড়াও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, মেনজিস এভিয়েশন নির্বাচিত হলে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে। এ অর্থ আধুনিক গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট, প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনব্যবস্থা, জনবল প্রশিক্ষণ এবং বিমানবন্দরের সামগ্রিক পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরেই সরাসরি এক হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যার প্রায় ৯৯ শতাংশ পদে বাংলাদেশিদের নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগী কার্যক্রমের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরও প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মেনজিস এভিয়েশন বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৬৫টি দেশের প্রায় ৩৫০টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। বছরে প্রায় ১৬ লাখ উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড এবং ২৪ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা প্রদানকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নতুন টার্মিনালেও এ দায়িত্ব পালন করবে।
তবে আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা, দ্রুত উড়োজাহাজ পরিচালনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় একটি অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, অত্যাধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিমানবন্দরের সফল পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল, উন্নত প্রযুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা অপরিহার্য।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের লাগেজ সরবরাহের সময়, উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড, এপ্রোন ব্যবস্থাপনা এবং ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। একই সঙ্গে আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করার দক্ষতাও থাকতে হবে।
তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় যাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে মেনজিস এভিয়েশন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াইডবডি উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে প্রথম লাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং শেষ লাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এ জন্য রিয়েল-টাইম ব্যাগেজ স্ক্যানিং, স্বয়ংক্রিয় পরিচালনব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মেনজিস এভিয়েশনের অপারেশনস বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন হেন্ডারসন জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ও কাজ বণ্টনের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে জনবল ও সরঞ্জাম নিয়োজিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনসের জন্য নিরাপদ, দক্ষ ও সময়ানুবর্তী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের তাৎক্ষণিক পরিচালনগত তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
মেনজিস এভিয়েশন বাংলাদেশে দায়িত্ব পেলে বিমানবন্দর এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, এভিয়েশন সেফটি, আধুনিক সরঞ্জাম পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিষয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পাশাপাশি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও এভিয়েশন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
জন হেন্ডারসন জানান, কর্মী নিয়োগের পর তিন মাসের মধ্যে তাঁদের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে।
প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি কর্মীরা ভবিষ্যতে মেনজিসের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কভুক্ত বিভিন্ন বিমানবন্দরে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সেবা খাতে মেনজিসের অবস্থান তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উন্নত প্রশিক্ষণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পরিচালনব্যবস্থার মাধ্যমে। এসব সক্ষমতার কারণেই বিভিন্ন বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানটির সেবা গ্রহণ করছে।
এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক প্রস্তাব বা বিনিয়োগের পরিমাণ বিবেচনা করলেই হবে না। প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা মানদণ্ড, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যাত্রীসেবার মান এবং স্থানীয় জনবল উন্নয়নের পরিকল্পনাও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ কী ধরনের প্রযুক্তিগত ও পরিচালনগত সক্ষমতা অর্জন করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে সেবার মানোন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন