এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বিশ্ব এভিয়েশন ইতিহাসের অন্যতম বড় অমীমাংসিত রহস্য মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ৩৭০-এর সন্ধানে আরও এক বছর অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান Ocean Infinity-এর সঙ্গে অনুসন্ধান চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
নতুন মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের নির্ধারিত অনুসন্ধান এলাকার যে অংশ এখনো জরিপ করা সম্ভব হয়নি, সেখানে অভিযান সম্পন্ন করতে আরও সময় পাচ্ছে Ocean Infinity।
মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোক জানিয়েছেন, নিখোঁজ যাত্রী ও ক্রুদের পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উত্তর খুঁজে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের অব্যাহত অঙ্গীকার থেকেই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
২০২৫ সালে মালয়েশিয়া সরকার ও Ocean Infinity-এর মধ্যে হওয়া চুক্তিতে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের প্রায় ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন এলাকাকে এমএইচ৩৭০-এর সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে অনুসন্ধানের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
মালয়েশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দুই ধাপে মোট ২৮টি কার্যকর অনুসন্ধান দিনে প্রায় ৭ হাজার ৫৭১ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রতল জরিপ করা হয়েছে।
এরপরও নির্ধারিত এলাকার ৭ হাজার ৪২৮ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার অনুসন্ধান করা বাকি। অর্থাৎ ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের নির্ধারিত অনুসন্ধান এলাকার প্রায় অর্ধেক এখনো পুরোপুরি পরীক্ষা করা হয়নি।
নতুন মেয়াদে তাই বিশাল ভারত মহাসাগরজুড়ে নতুন করে নির্বিচারে অনুসন্ধানের পরিবর্তে নির্ধারিত এলাকার অবশিষ্ট অংশ সম্পন্ন করাই হবে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
চুক্তির মেয়াদ বাড়লেও এর গুরুত্বপূর্ণ ‘No Find, No Fee’ শর্ত অপরিবর্তিত থাকছে।
এই শর্ত অনুযায়ী, অভিযান চালানোর পরও এমএইচ৩৭০-এর ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলে Ocean Infinity-কে মালয়েশিয়া সরকার কোনো অর্থ দেবে না।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ সফলভাবে শনাক্ত করতে পারলে ৭ কোটি মার্কিন ডলার পাবে।
ফলে অনুসন্ধান অভিযানের আর্থিক ঝুঁকির বড় অংশ Ocean Infinity-কেই বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে উড়োজাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করতে পারলে প্রতিষ্ঠানটির জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রণোদনাও রয়েছে।
চুক্তির মেয়াদ পুরো এক বছর বাড়ানো হলেও টানা ১২ মাস দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে অনুসন্ধান চলবে না।
Ocean Infinity-এর নতুন কিছু বাণিজ্যিক প্রকল্পের কারণে অনুসন্ধানে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল সম্পদ সাময়িকভাবে অন্য কাজে পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব সম্পদ পুনরায় এমএইচ৩৭০ অনুসন্ধানে ব্যবহারের জন্য নভেম্বর ২০২৬ থেকে এপ্রিল ২০২৭ সময়কালকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এই সময় দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের তুলনামূলক শান্ত সামুদ্রিক পরিস্থিতিও অনুসন্ধানের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গভীর সমুদ্রের তলদেশে সুনির্দিষ্ট জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে ঢেউ, বাতাস ও সামগ্রিক সামুদ্রিক পরিস্থিতি অনুসন্ধানকারী জাহাজ এবং পানির নিচে ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় যানের কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের Boeing 777-200ER উড়োজাহাজটি ২০১৪ সালের ৮ মার্চ কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল।
ফ্লাইটটিতে ২২৭ জন যাত্রী এবং ১২ জন ক্রু—মোট ২৩৯ জন আরোহী ছিলেন।
উড্ডয়নের পর একপর্যায়ে উড়োজাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় বিশ্ব এভিয়েশন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যয়বহুল অনুসন্ধান অভিযান।
বহু দেশ, জাহাজ ও উড়োজাহাজের অংশগ্রহণে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালানো হলেও এখন পর্যন্ত এমএইচ৩৭০-এর মূল ধ্বংসাবশেষ বা ফ্লাইট রেকর্ডার শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন উপকূলে পাওয়া কয়েকটি ধ্বংসাবশেষ এমএইচ৩৭০-এর বলে শনাক্ত বা সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছে। এরপরও উড়োজাহাজটির মূল ধ্বংসাবশেষ কোথায় রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
Ocean Infinity-এর জন্য এটি এমএইচ৩৭০ অনুসন্ধানের প্রথম অভিযান নয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালেও দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে উড়োজাহাজটির সন্ধানে বড় পরিসরে অভিযান চালিয়েছিল।
সেই অভিযানে ১ লাখ ১২ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্রতল জরিপ করা হলেও মূল ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্য, বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য অনুসন্ধান এলাকার ভিত্তিতে আবার Ocean Infinity-এর প্রস্তাব গ্রহণ করে মালয়েশিয়া সরকার। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ প্রায় ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন এলাকায় অনুসন্ধানের জন্য আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
দুই ধাপের সর্বশেষ অভিযানেও এমএইচ৩৭০-এর অবস্থান সম্পর্কে নতুন কোনো নিশ্চিত সূত্র পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধান করা এলাকাগুলো থেকে উড়োজাহাজটির অবস্থান সম্পর্কে সম্ভাবনার পরিধি আরও সংকুচিত করতে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে কাজে লাগতে পারে।
১২ বছরের বেশি সময় পার হলেও এমএইচ৩৭০ ঠিক কী কারণে নিখোঁজ হয়েছিল, তার চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি।
উড়োজাহাজটির মূল ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করা গেলে তদন্তকারীরা দুর্ঘটনাস্থলের অবস্থান, উড়োজাহাজের কাঠামোগত অবস্থা এবং সেখানে সংরক্ষিত থাকতে পারে—এমন গুরুত্বপূর্ণ আলামত বিশ্লেষণের সুযোগ পেতে পারেন।
ফ্লাইট রেকর্ডার বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার করা সম্ভব হলে এমএইচ৩৭০-এর শেষ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২৩৯ আরোহীর পরিবারের জন্য উড়োজাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করা দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি উত্তর এনে দিতে পারে।
এখন তাই নজর থাকবে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের অবশিষ্ট ৭ হাজার ৪২৮ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। নতুন অভিযানে এমএইচ৩৭০-এর মূল ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেলে এক যুগের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা আধুনিক এভিয়েশনের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটির তদন্তে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
তথ্যসূত্র: মালয়েশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় ও Bernama
মন্তব্য করুন