বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সারাদেশে চিহ্নিত ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্থানের মধ্যে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
একই সঙ্গে পর্যটকদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, এআইভিত্তিক ট্রাভেল অ্যাপ চালু, দক্ষ ট্যুরিস্ট পুলিশ তৈরি, কমিউনিটি ও ইকোট্যুরিজম সম্প্রসারণ এবং ঢাকাকে ঘিরে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তোলাসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা ও এর উন্নয়নে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব পরিকল্পনার কথা উঠে আসে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বিপিসি) আয়োজিত সভায় সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা পর্যটনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে খাতটির অবদান বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামান জানান, দেশের পর্যটন সম্ভাবনা চিহ্নিত করার অংশ হিসেবে সারাদেশে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
তবে প্রকল্পগুলো বর্তমানে পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে ১৯ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই ইতোমধ্যে বরাদ্দ বা ব্যয় হচ্ছে—এমনটি নয়। প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করার পর প্রকৃত ব্যয়ের চিত্র স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নে এতগুলো স্থান চিহ্নিত করার বড় সুবিধা হলো—কক্সবাজার, সুন্দরবন বা সিলেটের মতো পরিচিত গন্তব্যের বাইরে নতুন অঞ্চলকে পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হওয়া।
বিপিসি চেয়ারম্যানের মতে, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ৮ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে পর্যটন খাতে কর্মরত প্রায় ২৪ লাখ মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এগুলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ফলাফল; নিশ্চিত অর্জন নয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন, পর্যটকের সংখ্যা ও ব্যয়, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে।
পর্যটনের কর্মসংস্থান শুধু হোটেল বা ট্যুর অপারেটরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহন, খাবার, হস্তশিল্প, স্থানীয় গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিনোদন এবং বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে এর অর্থনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার জানান, পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক অবদান বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, AI-ভিত্তিক Travel App চালু, দক্ষ Tourist Police তৈরি এবং জেলা পর্যায়ে Community Tourism, Eco-tourism ও Water Tourism-এর উন্নয়ন।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রে ভিসা সহজীকরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একজন পর্যটক কোনো দেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিমানভাড়া ও হোটেলের পাশাপাশি ভিসা পেতে কত সময় লাগবে, কী নথি প্রয়োজন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করেন।
একইভাবে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে পর্যটন গন্তব্য, যাতায়াত, হোটেল, স্থানীয় পরিবহন, নিরাপত্তা ও জরুরি যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ঢাকাকে কেন্দ্র করে নদীনির্ভর পর্যটন চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার মতে, একটি Circular Waterway গড়ে তোলা হলে পর্যটকেরা বাংলাদেশের নদী, নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দেখার সুযোগ পাবেন।
ঢাকা ও আশপাশের নদীপথকে পরিকল্পিত পর্যটন সার্কিটে রূপান্তর করা গেলে রাজধানীকেন্দ্রিক পর্যটনে নতুন পণ্য যুক্ত হতে পারে।
তবে ওয়াটার ট্যুরিজম সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নৌযানের মান, লাইফ জ্যাকেট, প্রশিক্ষিত ক্রু, ঘাটের নিরাপত্তা, আবহাওয়ার সতর্কতা এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতাকে পরিকল্পনার শুরু থেকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রধান অতিথি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপি পর্যটন উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সড়ক, পরিবহন, বিমানবন্দর, নৌপথ ও আবাসন সুবিধা উন্নয়নের কথা বলেন।
একটি পর্যটন গন্তব্য আন্তর্জাতিক বাজারে আকর্ষণীয় হওয়ার ক্ষেত্রে সেখানে কত সহজে পৌঁছানো যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বিমানবন্দর থেকে পর্যটনকেন্দ্র পর্যন্ত কার্যকর যোগাযোগ, সরাসরি বা সুবিধাজনক ফ্লাইট এবং স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাকে একই পরিকল্পনায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা, দক্ষ ট্যুর গাইড তৈরি এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও আঞ্চলিক খাবারকে পর্যটনের অংশ হিসেবে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন।
সভায় পর্যটনকে শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম হিসেবে না দেখে সমন্বিত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
পর্যটন বিকাশের সঙ্গে সংস্কৃতি, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, স্থানীয় সরকার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, পররাষ্ট্র, পরিবেশ এবং নৌপরিবহনসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত।
উদাহরণ হিসেবে বিদেশি পর্যটকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভিসা ও ইমিগ্রেশন যেমন জড়িত, তেমনি পর্যটনকেন্দ্রের সড়ক, নিরাপত্তা, পরিবেশ, আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বিভিন্ন সংস্থার প্রকল্প আলাদাভাবে বাস্তবায়নের পরিবর্তে একই গন্তব্যকে কেন্দ্র করে সমন্বিত পরিকল্পনা করা গেলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি বিপিসিকে আরও বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি কক্সবাজার, সিলেট, কুয়াকাটা, খুলনা ও বাগেরহাটসহ সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে এসব গন্তব্যের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্র পর্যটন, সিলেট প্রকৃতি ও চা-বাগান, খুলনা-বাগেরহাট সুন্দরবন ও ঐতিহ্য এবং কুয়াকাটা উপকূলীয় পর্যটনের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র পর্যটন পণ্য হিসেবে বিকশিত হতে পারে।
পর্যটন সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হচ্ছে স্থানীয় ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি অর্থপ্রবাহ তৈরি করা।
পর্যটকের ব্যয় যদি স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, পরিবহন, হোমস্টে, গাইড এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় পৌঁছায়, তাহলে একটি পর্যটন প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিপিসি মনে করছে, পরিকল্পিত পর্যটন সম্প্রসারণ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি কার্যকর সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্য ১,৪৯৮টি স্থান চিহ্নিত করা এবং ৬০টি অগ্রাধিকার প্রকল্প নির্বাচন বড় পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিলেও এর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
কোন প্রকল্প আগে বাস্তবায়িত হবে, অর্থায়নের উৎস কী হবে, বেসরকারি বিনিয়োগ কীভাবে যুক্ত হবে, প্রকল্পগুলো পরিবেশগতভাবে কতটা টেকসই হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটা সরাসরি উপকৃত হবে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সহজ ভিসা, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, পর্যটক নিরাপত্তা, মানসম্মত সেবা এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রচারণা নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় পাওয়া মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের পরবর্তী পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিপিসি চেয়ারম্যান।
সূত্র: বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য
মন্তব্য করুন