টানা বর্ষণ ও উত্তাল সাগরের মধ্যে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের গোসলে নামা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ গুপ্তখাল বা রিপ কারেন্ট চিহ্নিত করে লাল নিশানা টানানো হলেও অনেক পর্যটক সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে সাগরে নামছেন।
পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে সৈকতে প্রশিক্ষিত ডুবুরির ঘাটতি। লাইফগার্ডরা পানির ওপরে স্রোতে ভেসে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারে সক্ষম হলেও কেউ পানির নিচে তলিয়ে গেলে বিশেষায়িত উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রশিক্ষিত ডুবুরি প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার ও ইনানী সৈকতে গোসলে নেমে দুই তরুণের মৃত্যুর ঘটনাও পর্যটকদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
পুলিশ ও লাইফগার্ড সূত্র জানায়, গত ২৭ জুন কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা মোহাম্মদ সায়েম (২২)।
পরদিন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে রেজু খাল এলাকায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত ৩১ মে সি-গাল সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হন ঢাকার বাসিন্দা মো. আবির (১৮)। পরদিন নাজিরারটেক সৈকতে তাঁর মরদেহ ভেসে ওঠে।
এ দুটি ঘটনা দেখাচ্ছে, সৈকতে সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে—বিশেষ করে সাগর উত্তাল থাকা এবং শক্তিশালী স্রোত তৈরি হওয়ার সময়।
লাইফগার্ড কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, সুগন্ধাসহ কক্সবাজার সৈকতের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ১৭টি গুপ্তখাল চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যটকদের সতর্ক করতে লাল নিশানা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লাইফগার্ড কর্মী মো. আলম জানান, বৈরী আবহাওয়া ও ভারী বর্ষণের কারণে শুধু সুগন্ধা সৈকতের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাতেই নতুন করে পাঁচ থেকে ছয়টি গুপ্তখাল তৈরি হয়েছে।
সাগরের ঢেউ ও স্রোতের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে আগে কোনো জায়গায় নিরাপদে গোসল করেছেন—শুধু সেই অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে আবার একই জায়গায় পানিতে নামা নিরাপদ নাও হতে পারে।
সৈকতে প্রচলিতভাবে ‘গুপ্তখাল’ বলা হলেও এর সঙ্গে রিপ কারেন্ট বা তীর থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত শক্তিশালী স্রোতের সম্পর্ক থাকতে পারে।
সাগরের ঢেউ তীরে পানি নিয়ে আসার পর সেই পানি যখন সরু কোনো পথ দিয়ে দ্রুত আবার গভীর সমুদ্রের দিকে ফিরে যায়, তখন শক্তিশালী স্রোত তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের স্রোতে পড়লে একজন দক্ষ সাঁতারুও দ্রুত তীর থেকে দূরে চলে যেতে পারেন।
বিপদ আরও বাড়ে যখন আতঙ্কিত ব্যক্তি স্রোতের বিপরীতে সরাসরি তীরের দিকে সাঁতার কাটার চেষ্টা করেন। এতে দ্রুত শক্তি ক্ষয় হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষজ্ঞ নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম কাজ হলো আতঙ্কিত না হয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করা এবং শক্তি সংরক্ষণ করা।
পরিস্থিতি ও সক্ষমতা অনুযায়ী স্রোতের বিপরীতে সরাসরি লড়াই না করে তীরের সমান্তরাল দিকে সাঁতরে শক্তিশালী স্রোতের এলাকা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। এরপর নিরাপদ অবস্থান থেকে তীরের দিকে এগোতে হয়।
সাঁতার কেটে বের হওয়া সম্ভব না হলে ভেসে থেকে হাত তুলে বা শব্দ করে লাইফগার্ড ও আশপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা হলো—লাল নিশানা দেওয়া স্থানে পানিতেই না নামা এবং লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলা।
লাইফগার্ড কর্মীরা জানিয়েছেন, স্রোত বা ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া কাউকে দৃশ্যমান অবস্থায় উদ্ধার করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। কিন্তু কেউ পানির নিচে তলিয়ে গেলে উদ্ধার কার্যক্রম অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হয় প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জামের।
সৈকতে পর্যাপ্ত ডুবুরি না থাকায় বড় কোনো দুর্ঘটনার পর পানির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনা করা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
কক্সবাজারের মতো বিপুল পর্যটকসমাগমের সৈকতে তাই লাইফগার্ডের পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত ডুবুরি, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং দ্রুত জরুরি সাড়াদানের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে ৭৬ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু গত বছরই মারা গেছেন ২৫ জন।
একই সময়ে স্রোতের টানে বা ঢেউয়ের ধাক্কায় ভেসে যাওয়া অন্তত ১ হাজার ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশের বয়স ১৬ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ পরিসংখ্যান সৈকতে নিরাপদ গোসলের নিয়ম অনুসরণ, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড ও উদ্ধার সক্ষমতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসাতেও।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানিয়েছেন, গত সপ্তাহ থেকে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সড়ক ও রেল যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ অগ্রিম হোটেল বুকিং বাতিল হয়েছে।
তবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় শুক্রবার থেকে আবার পর্যটকদের আগমন বাড়তে শুরু করেছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল ও রিসোর্টে ২০ হাজারের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন।
সৈকতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের উপস্থিতি দেখা গেলেও তাদের একটি অংশ স্থানীয় বাসিন্দা ও একদিনের ভ্রমণকারী বলে জানিয়েছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা।
পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ভ্রমণ সাময়িকভাবে সীমিত বা নিরুৎসাহিত হওয়ায় অনেক পর্যটক বিকল্প গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারে আসছেন বলে জানিয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।
ফলে আবহাওয়ার উন্নতির সঙ্গে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়লে সৈকতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পর্যটকদের শুধু আবহাওয়া ভালো দেখেই সাগরে নামার সিদ্ধান্ত না নিয়ে সৈকতের লাল নিশানা, লাইফগার্ডের নির্দেশনা এবং স্থানীয় সতর্কবার্তা অনুসরণ করা জরুরি।
বিশেষ করে উত্তাল সাগরে শিশু-কিশোরদের একা পানিতে নামতে না দেওয়া, রাতে বা লাইফগার্ডবিহীন এলাকায় গোসল না করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ছবি বা ভিডিও তুলতে গিয়ে পানিতে না নামা নিরাপদ ভ্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজার ভ্রমণে সমুদ্রই প্রধান আকর্ষণ হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ায় পর্যটকদের কাছে আনন্দের চেয়ে নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: পুলিশ, সি-সেফ লাইফগার্ড ও কক্সবাজারের পর্যটনসংশ্লিষ্টদের তথ্য
মন্তব্য করুন