বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় Visa on Arrival (VoA) সুবিধা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পর্যটন, হসপিটালিটি, বিমান যোগাযোগ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আফরোজা খানম ও প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতির বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বৈঠকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সহযোগিতা, বিমান যোগাযোগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৭ সালে বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে যৌথ পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
বৈঠকে পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় একটি গন্তব্য। এ কারণে বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের জন্য দেশটিতে Visa on Arrival সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতি এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তবে ভ্রমণকারীদের জন্য এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন—এই বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের জন্য নতুন করে Visa on Arrival সুবিধা কার্যকর বা নিশ্চিত করা হয়নি।
বাংলাদেশ এ সুবিধা চেয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত বিষয়টি এগিয়ে নিতে সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছেন। ফলে ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের আগে যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ ভিসা ও প্রবেশবিধি যাচাই করা উচিত।
বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়ায় পর্যটনের ক্ষেত্রে বালি সবচেয়ে পরিচিত গন্তব্যগুলোর একটি। এর পাশাপাশি জাকার্তা, লোম্বক, যোগ্যাকার্তা ও দেশটির অন্যান্য পর্যটন অঞ্চলও আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।
ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হলে স্বল্পমেয়াদি ছুটি ও leisure travel-এর ক্ষেত্রে একটি গন্তব্য বেছে নেওয়া পর্যটকদের জন্য তুলনামূলক সহজ হয়।
তবে Visa on Arrival থাকলেও সেটি visa-free travel নয়। VoA-এর ক্ষেত্রে সাধারণত যোগ্যতা, পাসপোর্টের মেয়াদ, ফি, অবস্থানের সময়সীমা, ফিরতি বা onward ticket এবং অন্যান্য প্রবেশশর্ত থাকতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে কার্যকর নিয়ম যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশের hospitality workforce-এর দক্ষতা উন্নয়ন।
প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে National Hotel and Tourism Training Institute (NHTTI) আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত NHTTI-এর সঙ্গে একটি Memorandum of Understanding (MoU) স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং hospitality sector-এ দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে MoU করার আগ্রহ প্রকাশ এবং চুক্তি স্বাক্ষর এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে এটিকে প্রস্তাবিত সহযোগিতা হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন শিল্পের বড় শক্তিগুলোর একটি হলো একই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের tourism product তৈরি করা।
সমুদ্রসৈকত, দ্বীপ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রকৃতি এবং স্থানীয় খাবার—বিভিন্ন উপাদানকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করেছে দেশটি।
বাংলাদেশেও কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চল, পুরান ঢাকা এবং বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে আলাদা tourism circuit তৈরির সুযোগ রয়েছে।
এক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নয়, পর্যটনকর্মীদের আচরণ, ভাষাগত দক্ষতা, hotel management, food service, tour operation এবং customer experience-এর মানও আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে NHTTI-এর মতো প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের hospitality sector-এর মানবসম্পদ উন্নয়নে তা কার্যকর হতে পারে।
আলোচনায় পর্যটনের পাশাপাশি বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও উঠে এসেছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক aviation hub হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশে Maintenance, Repair and Overhaul (MRO) সুবিধা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
MRO হচ্ছে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও বড় ধরনের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিশেষায়িত ব্যবস্থা।
দেশে আন্তর্জাতিক মানের MRO সক্ষমতা তৈরি হলে স্থানীয় এয়ারলাইনগুলোর কিছু maintenance কার্যক্রম বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজন কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক এয়ারলাইনগুলোর জন্যও বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি maintenance destination হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে এ ধরনের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক certification, দক্ষ aircraft engineer ও technician, spare-parts supply chain এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক চাহিদা প্রয়োজন।
সরকার বর্তমানে বিষয়টি বিবেচনা করছে; নির্দিষ্ট MRO প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সময়সূচি এই বৈঠকে ঘোষণা করা হয়নি।
বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন সহযোগিতা বাড়াতে সহজ ভিসার পাশাপাশি air connectivity-ও গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্দোনেশিয়ার সরকারি বিবরণে দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগ উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্যটকের জন্য কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ transit বা একাধিক connecting flight প্রয়োজন হলে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়। ফলে পর্যটন বাজার সম্প্রসারণে সহজ বিমান যোগাযোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বৈঠকের প্রকাশিত তথ্যে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে নতুন কোনো সরাসরি ফ্লাইট চালুর নির্দিষ্ট ঘোষণা বা সময়সূচি দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া পর্যটন সহযোগিতার আলোচনায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে সামনে এসেছে—সহজ ভিসা ব্যবস্থা, উন্নত বিমান যোগাযোগ এবং দক্ষ hospitality workforce।
একটি দেশের পর্যটন বাজার সম্প্রসারণে এই তিনটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ভিসা সহজ হলেও বিমান যোগাযোগ জটিল হলে পর্যটকের আগ্রহ কমতে পারে। আবার বিমান যোগাযোগ ভালো হলেও গন্তব্যে আন্তর্জাতিক মানের সেবা না থাকলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফলে বাংলাদেশ যদি ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রশিক্ষণ, পর্যটন উন্নয়ন ও বিমান যোগাযোগে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে দুই দেশের মধ্যে পর্যটক চলাচল এবং people-to-people contact বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের জন্য Visa on Arrival-এর বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ভ্রমণকারীদের ইন্দোনেশিয়ার কার্যকর ভিসা ও প্রবেশবিধি যাচাই করেই ভ্রমণ পরিকল্পনা করা উচিত।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
মন্তব্য করুন