এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ও যাত্রীর চাপ ব্যবহারিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর নতুন অতিরিক্ত নির্ধারিত আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ফ্লাইটের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর রাখার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে বর্তমানে অনুমোদিত সময়সূচি ও ফ্রিকোয়েন্সিতে পরিচালিত ফ্লাইটগুলো এ সিদ্ধান্তের আওতায় বন্ধ হচ্ছে না।
একই সঙ্গে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহারে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে উৎসাহিত করছে বেবিচক।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে ৩৮টি এয়ারলাইন্সকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ও উড়োজাহাজ চলাচল বিমানবন্দরের ব্যবহারিক handling capacity-এর সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। এ অবস্থায় বেবিচকের অনুমোদিত সময়সূচি ও frequency-এর বাইরে নতুন কোনো scheduled international passenger flight-এর আবেদন আপাতত অনুমোদন করা সম্ভব হবে না।
অর্থাৎ কোনো বিদেশি এয়ারলাইন বর্তমানে সপ্তাহে নির্দিষ্টসংখ্যক অনুমোদিত ফ্লাইট পরিচালনা করলে সেটি চালিয়ে যেতে পারবে। সাময়িক বিধিনিষেধটি মূলত বর্তমান অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত scheduled passenger flight যোগ করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এ কারণে সিদ্ধান্তটিকে বিদেশি এয়ারলাইন্সের বাংলাদেশে ফ্লাইট বন্ধ বা বিদ্যমান ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বেবিচকের চিঠিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা হয়েছে। কোনো এয়ারলাইন আগে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি slot পেয়ে থাকলেও সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্লাইট পরিচালনার operational approval হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
এভিয়েশনে airport slot সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিমানবন্দরের অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনায় slot-এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অন্যান্য operational requirements পূরণ করতে হয়।
ফলে পূর্বে পাওয়া slot দেখিয়ে বর্তমান অনুমোদিত frequency-এর বাইরে নতুন ফ্লাইট শুরু করা যাবে না—বেবিচকের সিদ্ধান্তে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
বেবিচকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৪০ থেকে ১৬০টি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি দৈনিক প্রায় ১২৫ থেকে ১৪০টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এবং ১০ থেকে ১৬টি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
ব্যক্তিমালিকানাধীন হেলিকপ্টারসহ সব ধরনের চলাচল বিবেচনায় বিমানবন্দরটিতে প্রতিদিন প্রায় ৩১৬টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করছে।
এ বিপুল traffic শুধু runway-এর ওপর নয়; একই সঙ্গে taxiway, aircraft parking, terminal, aerobridge, check-in counter, immigration, security screening এবং baggage handling ব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শাহজালালে সমস্যাটি শুধু দৈনিক মোট ফ্লাইটসংখ্যার নয়। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কাছাকাছি ব্যবধানে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ ও ছেড়ে যাওয়ার কারণে টার্মিনালের ওপর চাপ দ্রুত বেড়ে যায়।
একই সময়ে কয়েকটি wide-body আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পৌঁছালে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক যাত্রী immigration, baggage claim এবং terminal exit-এর দিকে অগ্রসর হন।
আবার departure-এর ব্যস্ত সময়ে check-in, security এবং immigration-এ একই ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ফলে বিমানবন্দরের দৈনিক মোট সক্ষমতার পাশাপাশি peak-hour capacity-ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে অনুমোদিত ফ্লাইটে ভ্রমণকারী যাত্রীদের জন্য বেবিচকের এ সিদ্ধান্তের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার কথা নয়।
মূল পরিবর্তন হচ্ছে, বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো আপাতত তাদের অনুমোদিত schedule ও frequency-এর বাইরে শাহজালালে নতুন অতিরিক্ত scheduled passenger flight যোগ করার অনুমোদন পাবে না।
এর ফলে কোনো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ঢাকায় নতুন frequency বাড়ানোর পরিকল্পনা করে থাকলে সেটি তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে অথবা বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারে।
ঢাকার ওপর চাপ কমাতে বেবিচক বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সামনে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহারের বিকল্প রেখেছে।
যেসব বিদেশি এয়ারলাইন্সের বাংলাদেশে নিজস্ব operational base নেই এবং অতিরিক্ত scheduled flight পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে, তারা চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতির জন্য বেবিচকের কাছে আবেদন করতে পারবে।
এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এর দুটি সম্ভাব্য সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, শাহজালালের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের অন্য দুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের যাত্রীদের জন্যও সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়লে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রয়োজন কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে।
তবে কোনো বিদেশি এয়ারলাইন চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে নতুন ফ্লাইট শুরু করবে কি না, সেটি যাত্রীচাহিদা, বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা, bilateral traffic rights, airport facilities এবং প্রয়োজনীয় regulatory approval-সহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে বর্তমানে যে পরিমাণ ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে তা বিদ্যমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণেই অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
তবে এয়ারলাইন্সগুলো চাইলে চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য আবেদন করতে পারবে বলে জানান তিনি।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ও টার্মিনাল হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তখন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অনুমোদনের বর্তমান সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে বেবিচক।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান aviation gateway। দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের বড় অংশ এ বিমানবন্দরকেন্দ্রিক হওয়ায় যাত্রী ও ফ্লাইট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালের ওপর চাপও বেড়েছে।
তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে নতুন check-in facility, passenger processing area, baggage handling এবং অন্যান্য terminal facilities যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে যাত্রীসেবা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নতুন টার্মিনাল চালু হলেই বিমানবন্দরের সব ধরনের capacity constraint একসঙ্গে দূর হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ একটি বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা নির্ভর করে terminal capacity-এর পাশাপাশি runway, taxiway, apron, air traffic management, ground handling এবং peak-hour aircraft movement-এর ওপরও।
বেবিচকের বর্তমান সিদ্ধান্ত তাই শাহজালালের বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণের একটি সাময়িক capacity-management measure হিসেবে দেখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলকে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে চট্টগ্রাম ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করছে। এখন নজর থাকবে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর কেউ এই বিকল্প গ্রহণ করে নতুন আন্তর্জাতিক রুট বা অতিরিক্ত ফ্লাইট চট্টগ্রাম ও সিলেটে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় কি না।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)
মন্তব্য করুন