এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহনের ইতিহাসে একসময় সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল জিএমজি এয়ারলাইন্স (GMG Airlines)। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আকাশপথেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করে। ছোট ড্যাশ ৮ উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে বোয়িং ৭৪৭-এর মতো বৃহৎ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজও যুক্ত হয়েছিল তাদের বহরে। কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণের সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত থেমে যায় আর্থিক সংকট, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি ও উড়োজাহাজের কারিগরি সমস্যায়।
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জিএমজি এয়ারলাইন্স ১৯৯৮ সালের ৬ এপ্রিল বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, বরিশাল ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করত।
অভ্যন্তরীণ বাজারে কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক রুটে প্রবেশের উদ্যোগ নেয় জিএমজি। ২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম–কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
পরবর্তী সময়ে কলকাতা, ব্যাংকক, নয়াদিল্লি, কাঠমান্ডু, কুয়ালালামপুর, দুবাই, জেদ্দা ও রিয়াদসহ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে জিএমজি। তবে এসব রুট একই সময়ে চালু ছিল না। ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ও বহরের সক্ষমতার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে রুট ও ফ্লাইট সূচি।
জিএমজি এয়ারলাইন্সের প্রাথমিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল কানাডায় নির্মিত বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ সিরিজের টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ।
২০০৪ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় প্রতিষ্ঠানটির বহরে দুটি ৩৭ আসনের ড্যাশ ৮-১০০ এবং একটি ৫০ আসনের ড্যাশ ৮-৩০০ উড়োজাহাজ ছিল।
পরবর্তী সময়ে বহরে যুক্ত হয় ম্যাকডোনেল ডগলাস এমডি-৮২ ও এমডি-৮৩, বোয়িং ৭৬৭-৩০০ইআর এবং বোয়িং ৭৪৭-৩০০-এর মতো উড়োজাহাজ। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও স্বল্প দূরত্বের আঞ্চলিক রুটের পাশাপাশি দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি।
জিএমজি এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ছিল বোয়িং ৭৪৭-৩০০ পরিচালনা।
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিজ নেওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৩০০ উড়োজাহাজ দিয়ে ঢাকা–দুবাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির আসনসংখ্যা ছিল ৫৪৩।
বৃহৎ আকারের এ উড়োজাহাজ পরিচালনা জিএমজির আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার প্রতিফলন হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
বিশ্ববাজারে উড়োজাহাজের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপ প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ২০০৮ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সংবাদে জিএমজির চেয়ারম্যান বোয়িং ৭৪৭-৩০০ উড়োজাহাজটি লিজদাতার কাছে ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
ঢাকা–দুবাই রুটে অন্য এয়ারলাইন্সের সঙ্গে ভাড়ার প্রতিযোগিতার কথাও বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসে। তবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো এয়ারলাইন্সের ভাড়া কমানোর কারণে জিএমজির ওই রুটে যাত্রী কমে গিয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আন্তর্জাতিক রুটে সম্প্রসারণের পরও জিএমজির ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। বহরে বিভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজ থাকলেও সেগুলোর সবগুলো সচল রাখা সম্ভব হয়নি।
২০১২ সালের ২৭ মার্চ দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় জিএমজি এয়ারলাইন্সের বহরে মোট আটটি উড়োজাহাজ ছিল। এর মধ্যে ছয়টি ২০১০ ও ২০১১ সালে গ্রাউন্ডেড হয়ে যায়।
ফলে শেষ পর্যায়ে মাত্র দুটি ড্যাশ ৮ উড়োজাহাজ দিয়ে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনা করছিল প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু ২০১২ সালের মার্চে অবশিষ্ট দুটি উড়োজাহাজেও ইঞ্জিনসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়। কারিগরি পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেগুলোও গ্রাউন্ডেড করতে হলে ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
জিএমজি এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে শুধু উড়োজাহাজের কারিগরি সমস্যাই নয়, দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে জিএমজির বকেয়া ছিল ৪৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে ট্রাভেল ট্যাক্স বাবদ বকেয়া ছিল ১৮ কোটি টাকা।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘ দূরত্বের রুট পরিচালনার ব্যয় এবং বহরের উড়োজাহাজ সচল রাখতে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থাকে আরও চাপে ফেলে।
২০১২ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইএটিএর বিলিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্ল্যান (BSP) থেকেও জিএমজিকে স্থগিত করা হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
অবশেষে ২০১২ সালের ২৮ মার্চ জিএমজি এয়ারলাইন্স সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩০ মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠানটির ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়।
সে সময় নতুন ব্যবসায়িক কৌশল গ্রহণ এবং বহর পুনর্গঠনের মাধ্যমে আবার কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনায় আর ফিরতে পারেনি জিএমজি।
প্রায় ১৪ বছরের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার পর বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্সের আকাশযাত্রা এভাবেই থেমে যায়।
জিএমজি এয়ারলাইন্সের উত্থান ও পতন বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছিল, বেসরকারি উদ্যোগেও অভ্যন্তরীণ রুট থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ পরিচালনা সম্ভব।
একই সঙ্গে এর ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, শুধু নতুন রুট চালু কিংবা বড় উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করাই একটি এয়ারলাইন্সের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করে না। আর্থিক সক্ষমতা, জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সচল বহর এবং টেকসই ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় বাংলাদেশের আকাশে পরিচিত নাম হয়ে ওঠা জিএমজি এয়ারলাইন্স আজ আর ফ্লাইট পরিচালনা করে না। তবে দেশের বেসরকারি বিমান চলাচলের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ও অভিজ্ঞতা এখনো প্রাসঙ্গিক।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার
মন্তব্য করুন