৯/১১ হামলার ২৫ বছর: বৈশ্বিক বিমান নিরাপত্তা জোরদারে নতুন অঙ্গীকার ICAO’র
aviation
প্রকাশিত: 29 September 2026, 9:17:46 Am
|অনলাইন সংস্করণ
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে International Civil Aviation Organization (ICAO)। একই সঙ্গে সাইবার হামলা, ড্রোনের অপব্যবহার, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকার মতো নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘের এই বিশেষায়িত সংস্থা।
ICAO কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট তোশিউকি ওনুমা এবং মহাসচিব হুয়ান কার্লোস সালাজার এক যৌথ বার্তায় ৯/১১ হামলায় নিহত ২ হাজার ৯৭৭ জন এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের স্মরণ করেন। তাদের বক্তব্যের মূল বার্তা—বেসামরিক বিমান চলাচলকে ভবিষ্যতে এ ধরনের বেআইনি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করাই নিহতদের প্রতি অর্থবহ সম্মান।
৯/১১-এর পর বদলে যায় বৈশ্বিক এভিয়েশন নিরাপত্তা
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো হয়। এর পর শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বব্যাপী বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
ICAO জানিয়েছে, হামলার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ট্রিয়লে সংস্থাটির সদর দপ্তরে ১৬৯টি দেশের প্রতিনিধিরা একত্রিত হন। সেখানে বেসামরিক উড়োজাহাজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে যাত্রী ও ব্যাগেজ স্ক্রিনিং, ককপিট নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যাত্রী-সংক্রান্ত আগাম তথ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান আরও শক্তিশালী করা হয়।
নতুন হুমকি মোকাবিলায় বেইজিং কনভেনশন
৯/১১-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ২০১০ সালের Beijing Convention এবং Beijing Protocol। ICAO-এর নথি অনুযায়ী, দুটি দলিলই ২০১০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে গৃহীত হয় এবং যথাক্রমে ২০১৮ সালের জুলাই ও জানুয়ারিতে কার্যকর হয়।
এই আইনি কাঠামো বেসামরিক বিমান চলাচলের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড মোকাবিলার সুযোগ বাড়ায়। এর মধ্যে কোনো বেসামরিক উড়োজাহাজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, বিপজ্জনক জৈবিক, রাসায়নিক বা পারমাণবিক উপাদান ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধে সহায়তার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর ফলে শুধু হামলাকারী নয়, পরিকল্পনা, সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা শক্তিশালী করার ভিত্তি তৈরি হয়।
সব দেশে এখনো সমানভাবে কার্যকর হয়নি
তবে ৯/১১-এর ২৫ বছর পরও বৈশ্বিক এভিয়েশন নিরাপত্তার আইনি কাঠামো সব দেশে একই মাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৭০ সালের Hague Convention এবং ১৯৭১ সালের Montreal Convention-এর মতো পুরোনো এভিয়েশন নিরাপত্তা চুক্তিগুলো ব্যাপক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পেলেও তুলনামূলক নতুন Beijing Convention ও Protocol-এ অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। ICAO নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশকে এসব আন্তর্জাতিক এয়ার-ল চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রশাসনিক ও আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে।
২০২৬ সালেও নতুন দেশ Beijing Convention-এ যোগ দিয়েছে—উদাহরণ হিসেবে উত্তর মেসিডোনিয়া ও সৌদি আরবের accession নথিভুক্ত হয়েছে।
ICAO মনে করে, বৈশ্বিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে এতটাই সংযুক্ত যে একটি দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা অন্য দেশের বিমান চলাচলেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যাত্রী শনাক্তে API ও PNR কেন গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তায় এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে Advance Passenger Information (API) এবং Passenger Name Record (PNR) ব্যবস্থা।
API-এর মাধ্যমে সাধারণত যাত্রীর পাসপোর্ট ও ভ্রমণ নথি-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য আগাম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। অন্যদিকে PNR-এ যাত্রীর বুকিং ও ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য থাকতে পারে।
আইনগত কাঠামো ও প্রয়োজনীয় তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে এসব তথ্য ব্যবহার করে সীমান্ত কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই করতে পারে।
নতুন চ্যালেঞ্জ সাইবার হামলা ও ড্রোন
২০০১ সালের তুলনায় বর্তমান বেসামরিক বিমান চলাচল অনেক বেশি ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির ধরনও বদলে গেছে।
ICAO বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা, insider threat, Unmanned Aircraft Systems বা ড্রোনের অপব্যবহার, নেভিগেশন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, supply-chain vulnerability এবং conflict-zone risk-কে গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বিশেষ করে ড্রোনের দ্রুত বিস্তারের কারণে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো নিয়েও নতুন কাজ চলছে। ICAO-এর Legal Committee-তে UAS-সংক্রান্ত আইনি বিষয় পর্যালোচনার জন্য আলাদা task force/working group প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কাজ হয়েছে।
ডিজিটাল এভিয়েশনে সাইবার নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক বিমান পরিবহন শুধু উড়োজাহাজের ওপর নির্ভরশীল নয়। এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, বিমানবন্দর অপারেশন, এয়ারলাইন রিজার্ভেশন, যাত্রী তথ্য, ফ্লাইট পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন যোগাযোগ ও নেভিগেশন ব্যবস্থা ক্রমেই ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় সাইবার আক্রমণ বা অননুমোদিত প্রবেশ হলে তা সরাসরি উড়োজাহাজে হামলা না করেও বিমানবন্দরের কার্যক্রম, ফ্লাইট সূচি বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় physical security-এর পাশাপাশি cyber resilience-ও আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
USAP-এর মাধ্যমে দেশগুলোর নিরাপত্তা যাচাই
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যবেক্ষণে ICAO পরিচালনা করে Universal Security Audit Programme (USAP)।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বেসামরিক বিমান নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা এবং ICAO-এর সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মান বাস্তবায়নের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
এ ধরনের অডিটের উদ্দেশ্য শুধু দুর্বলতা শনাক্ত করা নয়; কোথায় সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন, সেটিও চিহ্নিত করা। কারণ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে একটি বিমান একাধিক দেশের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক মান ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের ওপর।
নিরাপত্তা এখন শুধু বিমানবন্দরের চেকপয়েন্টে সীমাবদ্ধ নয়
৯/১১-পরবর্তী সময়ে যাত্রীদের কাছে বিমান নিরাপত্তার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন ছিল কঠোর security screening। কিন্তু ২৫ বছর পর এভিয়েশন নিরাপত্তার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
এখন বিমানবন্দরের যাত্রী ও ব্যাগেজ স্ক্রিনিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামো, কর্মীদের প্রবেশাধিকার, যাত্রী তথ্য, ড্রোন, এয়ার নেভিগেশন ব্যবস্থা, কার্গো ও সাপ্লাই চেইন এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার ঝুঁকি—সবকিছুই বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ।
ICAO-এর বার্তার মূল বিষয়ও এখানেই—নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে হবে।
২০৫০ সালের লক্ষ্য
ICAO-এর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের জন্য বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচলকে আরও নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই করার লক্ষ্য রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—aviation safety এবং aviation security একই বিষয় নয়। Safety মূলত দুর্ঘটনা ও অপারেশনাল ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত, আর security-এর লক্ষ্য সন্ত্রাসবাদ, ছিনতাই ও অন্যান্য unlawful interference থেকে বিমান চলাচলকে রক্ষা করা।
ICAO-এর দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানি শূন্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের কার্বন নিঃসরণ নেট-জিরোর দিকে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
৯/১১ হামলার ২৫ বছর পর ICAO-এর বার্তা তাই শুধু অতীতের একটি ঘটনা স্মরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংস্থাটি মনে করছে, ভবিষ্যতের বিমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, এয়ারলাইন, বিমানবন্দর, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, আইনি সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সূত্র: International Civil Aviation Organization (ICAO)
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
ব্যয় কমাতে ৫০০ কর্মী ছাঁটাই ও একাধিক রুট বন্ধ করছে এর লিঙ্গা
1
আজ থেকে শুরু বেবিচকের ৮৯০ পদে আবেদন, চলবে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত
2
আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদিতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা
3
শাহজালালে কোন কাজ বেবিচকের, কোনটি বিমানের—জানুন দায়িত্বের সী
4
জমজমের পানি দিতে বিলম্ব, বিমানের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভ
5
বিমানের দুই বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজে আইএমএম মডিফিকেশন সম্পন্ন
6
সৌদি আরবে ফের ফ্লাইট বাড়াচ্ছে বিমান, দাম্মাম ও জেদ্দায় নতুন
7
রোমে আটকে বিমানের উড়োজাহাজ, মেরামতে ঢাকা থেকে গেল প্রকৌশলী দ
8
ডাবলিন বিমানবন্দরে রায়ানএয়ার কর্মীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিয
9
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, তেলআবিব ও দুবাইয়ে ফ্লাইট স্থগিতের মেয়
10
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরে রেকর্ড ৯৮০ কোটি যাত্রী
11
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে বেবিচকের নিয়োগ পরীক্ষা শুরু, আবে
12
শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি প্রতি
13
১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনে জাপানের সহযোগিতা চাইল ব
14
সমুদ্রের নিচে বোয়িং ৭৪৭, বাহরাইনে উড়োজাহাজই এখন ডাইভিং আকর্ষ
15
শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ হারালে কী করবেন? যাত্রীদের জন্য প
16
সিভিল এভিয়েশন একাডেমিতে প্রথমবারের মতো আইএলএস রক্ষণাবেক্ষণ প
17
আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে উঠছে কক্সবাজার বিমান