এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আবারও বড় স্বর্ণের চালান উদ্ধারের ঘটনায় সামনে এসেছে নতুন উদ্বেগ। সর্বশেষ সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটের টয়লেটে বিশেষভাবে লুকানো অবস্থায় পাওয়া গেছে ৫০টি স্বর্ণবার। এগুলোর মোট ওজন প্রায় ৫ দশমিক ৮৩২ কেজি এবং আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা।
তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিমানের উড়োজাহাজের টয়লেট, কার্গো কম্পার্টমেন্টসহ সাধারণ যাত্রীদের সহজে প্রবেশের সুযোগ নেই—এমন জায়গা থেকে স্বর্ণ উদ্ধারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বিমানকর্মীর কাছ থেকেও বড় চালান উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ ও সংরক্ষিত অংশকে ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র স্বর্ণ চোরাচালানের চেষ্টা করছে কি না।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকাগামী বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটে বড় স্বর্ণের চালান আসার গোপন তথ্য পাওয়া যায়। ফ্লাইটটি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর উড়োজাহাজটিতে নিবিড় তল্লাশি শুরু করেন কর্মকর্তারা। প্রায় চার ঘণ্টা পর টয়লেটের ভেতরে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা ৫০টি স্বর্ণবার পাওয়া যায়।
প্রতিটি বারের ওজন ছিল ১০ তোলা। অর্থাৎ মোট ৫০০ তোলা বা প্রায় ৫ দশমিক ৮৩২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বর্ণগুলো কোনো যাত্রীর ব্যাগ বা শরীর থেকে উদ্ধার হয়নি; সেগুলো উড়োজাহাজের ভেতরেই লুকানো ছিল। চালানটির পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বা বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টসংলগ্ন টয়লেটের অংশ থেকে প্রায় ১৮ কেজি ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে উড়োজাহাজের অভ্যন্তরের ঝুঁকিপূর্ণ ও সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সর্বশেষ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় আবারও টয়লেটের মতো উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ জায়গায় স্বর্ণ পাওয়ায় প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—চোরাচালানকারীরা কেন যাত্রীর ব্যাগেজের পরিবর্তে উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট অংশ ব্যবহার করছে?
আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে বিমানকর্মী জড়িত থাকার ঘটনা। গত ৫ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসা একটি ফ্লাইটে তল্লাশির সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টেকনিক্যাল হেলপার মোহাম্মদ সোয়েব গাজী সজিবকে আটক করা হয়।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তার কাছ থেকে ১২০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। মোট ওজন ছিল ১৩ কেজি ৯৯২ গ্রাম বা প্রায় ১৪ কেজি এবং আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বর্ণের বারগুলো শরীরের বেল্টের ভেতরে বিশেষভাবে লুকিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তল্লাশির সময় সন্দেহ হলে তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং পরে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় আটক করা হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মেজর ফারহান তানভিরের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানোর কারণেই এ ধরনের চালান শনাক্ত হচ্ছে। কোনো কর্মী চোরাচালানে জড়িত হলে তার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
যাত্রীর ব্যাগেজে স্বর্ণ বহনের সঙ্গে উড়োজাহাজের সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা স্থানে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখার মধ্যে নিরাপত্তাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
উড়োজাহাজ অবতরণের পর বিভিন্ন পর্যায়ে পাইলট ও কেবিন ক্রুর পাশাপাশি প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ, ক্লিনিং, ক্যাটারিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন অনুমোদিত কর্মী বিমানটির কাছাকাছি বা ভেতরে কাজ করতে পারেন। ফলে কোনো চোরাচালান চক্র উড়োজাহাজের অভ্যন্তরে চালান রেখে দিলে সেটি পরে কে সংগ্রহ করার কথা ছিল—এ প্রশ্ন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে শুধু উড়োজাহাজের ভেতরে স্বর্ণ পাওয়া গেছে বলেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মী বা বিভাগের সংশ্লিষ্টতা ধরে নেওয়া যায় না। সেটি প্রমাণের জন্য সিসিটিভি, কর্মীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার রেকর্ড, ডিউটি রোস্টার এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে স্বর্ণ চোরাচালানে উড়োজাহাজের বিভিন্ন অপ্রচলিত স্থান ব্যবহারের নজির পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কার্গো হোল্ডের অভ্যন্তরীণ প্যানেলের আশপাশ, টয়লেটের বিভিন্ন অংশ এবং কেবিনের নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে।
এ ধরনের অংশের কিছু জায়গায় সাধারণ যাত্রীর প্রবেশাধিকার থাকে না। ফলে সেখানে অবৈধ পণ্য পাওয়া গেলে সেটি কীভাবে সেখানে পৌঁছেছে এবং পরে কার মাধ্যমে বের করার পরিকল্পনা ছিল—এই দুই প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পায়।
এ কারণে গোয়েন্দা পর্যায়ের সুপারিশে উড়োজাহাজ থেকে মালামাল নামানো এবং হ্যাঙ্গার বা রক্ষণাবেক্ষণ এলাকায় নেওয়ার সময় সিসিটিভি নজরদারি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ আরও জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে অন্তত ১,৯০৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় ৩৮১ কেজি স্বর্ণ জব্দ হওয়ার হিসাব দাঁড়ায়।
একই তথ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১২৪ ও ১০৫ কেজি এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০৬ কেজির মতো বড় স্বর্ণের চালান উদ্ধারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে স্বর্ণ চোরাচালানসংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৭টি নিষ্পত্তি এবং ৫০টি তদন্তাধীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা দিয়ে চোরাচালান চক্রের মূল হোতাদের কতজন শনাক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তা বোঝা যায় না। বিশেষ করে মালিকবিহীন বা পরিত্যক্ত চালানের ক্ষেত্রে প্রকৃত পাচারকারী শনাক্ত করা তদন্তকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক তিনটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা একসঙ্গে ধরলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ২৮ মার্চ প্রায় ১৮ কেজি, ৫ সেপ্টেম্বর প্রায় ১৩ দশমিক ৯৯২ কেজি এবং ২১ সেপ্টেম্বর আরও ৫ দশমিক ৮৩২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে।
অর্থাৎ এই তিন ঘটনাতেই মোট প্রায় ৩৭ দশমিক ৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি ঘটনায় স্বর্ণ পাওয়া গেছে উড়োজাহাজের অভ্যন্তরের নির্দিষ্ট স্থানে এবং একটিতে বিমানকর্মীর কাছ থেকে।
এই ধারাবাহিকতাই এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী আল মাসুমের বক্তব্য অনুযায়ী, নজরদারি কমেনি; বরং সেই নজরদারির কারণেই বড় চালানগুলো ধরা পড়ছে। তিনি দাবি করেছেন, অন্যান্য এয়ারলাইন্সের তুলনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা বেশি দেখা যায় এবং কর্মী আটকের ঘটনাও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিমানকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার রইছ উদ্দীনও জানিয়েছেন, শুধু বিমান বাংলাদেশ নয়, যেকোনো এয়ারলাইন্সে অবৈধ পণ্য আসার তথ্য পাওয়া গেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
বিমানবন্দরে বড় স্বর্ণের চালান জব্দ হওয়া কার্যকর নজরদারির প্রমাণ হলেও প্রতিটি চালানের পেছনের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উড়োজাহাজের এমন অংশে স্বর্ণ পাওয়া গেলে যেখানে সাধারণ যাত্রীর প্রবেশাধিকার সীমিত, তখন বিদেশে স্বর্ণ উড়োজাহাজে তোলা থেকে শুরু করে ঢাকায় সেটি সংগ্রহ করার সম্ভাব্য পুরো শৃঙ্খল তদন্তের প্রয়োজন হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু চোরাচালানের পরিমাণের বিষয় নয়; এগুলো aircraft access control, staff screening, CCTV coverage, duty accountability এবং post-arrival aircraft security কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি, বিভাগ বা পুরো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে চোরাচালানে জড়িত থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। এখন মূল বিষয় হচ্ছে প্রতিটি ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে তা শনাক্ত করা এবং উড়োজাহাজের সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা স্থানগুলোকে ব্যবহার করে একই ধরনের ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্র: কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য, ঢাকা কাস্টম হাউস, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং প্রকাশিত প্রতিবেদন।
মন্তব্য করুন