মাঝ আকাশে জানালা ক্ষতিগ্রস্ত, অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন রায়ানএয়ারের যাত্রী
aviation
প্রকাশিত: 29 September 2026, 12:40:08 Pm
|অনলাইন সংস্করণ
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিঙ্গেনগামী রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটে মাঝ আকাশে গুরুতর ঘটনা ঘটে। উড্ডয়নের কয়েক মিনিট পর ডান পাশের ইঞ্জিনের একটি ফ্যান ব্লেড বিচ্ছিন্ন হয়ে ধাতব অংশ উড়োজাহাজের ফিউজলাজ ও কেবিনের জানালায় আঘাত করে। এতে জানালাটি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কেবিনের বায়ুচাপ দ্রুত কমে যায়। জানালার পাশে বসা এক যাত্রী আংশিকভাবে ওই খোলা অংশের দিকে টেনে নেওয়া হলেও সহযাত্রীদের সহায়তায় তাকে ভেতরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
ঘটনাটি ঘটে গত ১০ জুলাই, Ryanair-এর FR1879 ফ্লাইটে। Boeing 737-800 উড়োজাহাজটি Ryanair-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান Malta Air পরিচালনা করছিল। উড়োজাহাজে ১৪৯ যাত্রী, দুই পাইলট ও চার কেবিন ক্রু ছিলেন।
বিকট শব্দের পর নেমে আসে অক্সিজেন মাস্ক
ফ্লাইটটি থেসালোনিকি থেকে উড্ডয়নের পর প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার সময় ডান পাশের বা No. 2 ইঞ্জিনে অস্বাভাবিক কম্পন দেখা দেয়। পরে একটি fan-blade-out failure ঘটে এবং ইঞ্জিনের বিচ্ছিন্ন অংশ উড়োজাহাজের কাঠামোয় আঘাত করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ একটি বিকট শব্দ শোনার পর কেবিনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চাপ কমে যাওয়ায় যাত্রীদের জন্য জরুরি অক্সিজেন মাস্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে আসে।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটির কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের National Transportation Safety Board (NTSB)-এর প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত করা হয়, ডান ইঞ্জিনের একটি ফ্যান ব্লেড বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইঞ্জিনের ধাতব অংশ ফিউজলাজ ভেদ করে এবং ১১ নম্বর সারির একটি কেবিন জানালা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
জানালার পাশের যাত্রী গুরুতর আহত
ক্ষতিগ্রস্ত জানালার পাশের 11F আসনে বসেছিলেন ৬১ বছর বয়সী এক সার্বীয় যাত্রী। NTSB-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবিনের চাপ কমে যাওয়ার পর তাকে ক্ষতিগ্রস্ত জানালার অংশে আংশিকভাবে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্য যাত্রীরা দ্রুত তাকে ধরে কেবিনের ভেতরে ফিরিয়ে আনেন। Anadolu Ajansı
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তার মাথা ও কাঁধ জানালার খোলা অংশের দিকে চলে গিয়েছিল। পরে তাকে থেসালোনিকির হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার ঘাড় ও কাঁধে আঘাত এবং প্রবল বাতাসের কারণে friction burn হয়েছিল; তবে আঘাত প্রাণঘাতী ছিল না।
ঘটনার বর্ণনা নিয়ে অবশ্য পরবর্তীতে কিছু মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও যাত্রীর পরিবারের সদস্যরা তার শরীরের অংশ জানালার বাইরে চলে যাওয়ার কথা বললেও Ryanair-এর প্রধান নির্বাহী মাইকেল ও'লিয়ারি পরে এই বর্ণনার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন। NTSB-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে যাত্রীকে ক্ষতিগ্রস্ত জানালায় “partially lodged” অবস্থায় পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দ্রুত নিচে নামিয়ে আনা হয় উড়োজাহাজ
ঘটনার পর পাইলটরা জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে দ্রুত উড়োজাহাজটির উচ্চতা কমাতে শুরু করেন। Flightradar24-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকার সময় ঘটনাটি ঘটে এবং পরে প্রায় ৬ হাজার ফুটে নেমে আসে।
শেষ পর্যন্ত পাইলটরা মেমিঙ্গেনের যাত্রা বাতিল করে থেসালোনিকিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উড়োজাহাজটি সেখানে নিরাপদে অবতরণ করে।
Ryanair জানায়, যাত্রীরা নিরাপদে টার্মিনালে ফিরে যান এবং আহত যাত্রীকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়। বাকি যাত্রীদের জার্মানির মেমিঙ্গেনে পৌঁছে দিতে বিকল্প উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করা হয়। ITVX
ইঞ্জিনের ভেতরে মিলেছে পাখির আলামত
তদন্তে ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। NTSB তদন্তকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশে পাখির পালক ও অন্যান্য জৈব আলামত পেয়েছেন। তবে এসব আলামত ১০ জুলাইয়ের ঘটনার সময়কার কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘটনার আগের ১২ মাসে একই ইঞ্জিনে চারটি সন্দেহভাজন bird strike রিপোর্ট করা হয়েছিল। পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষায় ক্ষতি শনাক্ত না হলেও এর মধ্যে দুটি ঘটনায় পাখির অবশিষ্টাংশ পাওয়ার তথ্য ছিল।
NTSB আরও জানিয়েছে, ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগে মে মাসে ইঞ্জিনের fan blade-গুলোর ultrasonic inspection করা হয়েছিল এবং তখন কোনো ত্রুটি শনাক্ত হয়নি। ফলে ফ্যান ব্লেডটি ঠিক কী কারণে বিচ্ছিন্ন হলো, সেটিই চলমান তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
সিটবেল্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনাটি উড্ডয়নের পুরো সময় সম্ভব হলে সিটবেল্ট বাঁধা রাখার গুরুত্বও সামনে এনেছে। কেবিনে আকস্মিক decompression, তীব্র turbulence কিংবা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সিটবেল্ট যাত্রীকে আসনে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট যাত্রীর সিটবেল্ট বাঁধা ছিল এবং পরে অন্য যাত্রীরাও তাকে ধরে ভেতরে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেন।
চূড়ান্ত কারণ জানতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
প্রাথমিক তদন্তে ইঞ্জিনের fan blade বিচ্ছিন্ন হয়ে ধাতব অংশের আঘাতে জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও ফ্যান ব্লেডটি কেন ভেঙেছিল, সেটির চূড়ান্ত কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। পাখির আলামত, পূর্ববর্তী bird strike, ব্লেডের অবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা।
ঘটনাটি একই সঙ্গে দেখিয়েছে, মাঝ আকাশে গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি ও আকস্মিক decompression-এর মতো পরিস্থিতিতে পাইলটদের দ্রুত সিদ্ধান্ত, কেবিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের সিটবেল্ট ব্যবহারের মতো মৌলিক সতর্কতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তথ্যসূত্র: U.S. National Transportation Safety Board (NTSB)-এর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন, Ryanair-এর বক্তব্য, Flightradar24 এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্য।
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
বাংলাদেশ-সৌদি বিমান যোগাযোগে নতুন মাইলফলক, এভিয়েশন কূটনীতিতে
1
ট্রাফিক হেলপার পদে নির্বাচিত ৮৭ প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য ডাকল