এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ৪৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত যাত্রী প্রক্রিয়াকরণের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে উচ্চক্ষমতার সার্ভার ও সেন্ট্রাল স্টোরেজ থেকে শুরু করে আধুনিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, ফায়ারওয়াল, ই-পাসপোর্ট রিডার এবং Multimodal Biometric Identification System স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ এবং ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল বাড়তে পারে। ভবিষ্যতের সেই চাপ সামলানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় অপর্যাপ্ত সার্ভার ও স্টোরেজ সক্ষমতা, ধীরগতির নেটওয়ার্ক এবং সাইবার নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতার কথা প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী সংখ্যা বাড়লে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাগুলো ইমিগ্রেশন কার্যক্রমে আরও চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে নতুন টার্মিনালের কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইমিগ্রেশনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটির প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭।
গত ৬ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পের বড় অংশের ব্যয় নিয়ে আরও যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে পিইসি।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতির জন্য প্রায় ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও বাজারদর যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিটিকে বাজারদর যাচাই করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে এবং সেই প্রতিবেদন সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপিতে সংযুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
ফলে প্রকল্পটির মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ৪৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা হলেও এটিকে এখনই চূড়ান্ত অনুমোদিত ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
পিইসি সভায় প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা নিয়েও বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের ক্রয় প্যাকেজগুলো একত্র করা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্যাকেজের সংখ্যা না বাড়ানো, একক ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ এবং প্রতিটি ক্রয়ের অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে কয়েকটি প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্তও এসেছে।
ডিপিপি মুদ্রণ, স্টেশনারি ও সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ কমানোর পাশাপাশি প্রকল্প কার্যালয়ের আসবাবপত্র এবং কম্পিউটার-সংক্রান্ত দুটি বাজেট খাত বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সংযোজন হবে Multimodal Biometric Identification System।
এর সঙ্গে ই-পাসপোর্ট রিডার, কেন্দ্রীয় তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, উচ্চক্ষমতার সার্ভার, নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা অবকাঠামো যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসবির প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সরদার নুরুল আমিন বলেন, আধুনিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি একটি সমন্বিত ডেটাবেজে যাত্রীদের তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
এর ফলে নতুন টার্মিনালে যাত্রী প্রক্রিয়াকরণের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সক্ষমতাও শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ডিসেম্বরে উদ্বোধন হতে পারে উল্লেখ করে এসবি প্রধান জানিয়েছেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে এর বাস্তবায়ন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে প্রকল্প প্রস্তাবে বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে। ফলে নভেম্বরের সময়সীমাটি এসবি প্রধানের ঘোষিত বাস্তবায়ন লক্ষ্য হিসেবে বিবেচ্য; প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ হিসেবে নয়।
একইভাবে তৃতীয় টার্মিনাল ডিসেম্বরে উদ্বোধনের বিষয়টিও এখন পর্যন্ত একটি লক্ষ্য, চূড়ান্ত উদ্বোধনের তারিখ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তৃতীয় টার্মিনালের অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা চালুর ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, ব্যাগেজ, কাস্টমসসহ বিভিন্ন অপারেশনাল ব্যবস্থার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যাত্রী সংখ্যা বাড়লে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দ্রুত পরিচয় যাচাই, পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার সক্ষমতা সরাসরি যাত্রীসেবার ওপর প্রভাব ফেলবে।
প্রস্তাবিত ৪৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকার প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশন কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রী প্রক্রিয়াকরণ, বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ এবং তথ্য নিরাপত্তায় নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে তার আগে প্রকল্পের বড় অংশজুড়ে থাকা সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতির ব্যয় যাচাই, ক্রয় পরিকল্পনা সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সূত্র: বাংলাদেশ পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়নসংক্রান্ত তথ্য
মন্তব্য করুন