এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর ক্যানোপিতে যাত্রীদের স্বজনের পাশাপাশি গাড়ির দালাল, সিএনজি চালক ও কৌতূহলী দর্শনার্থীদের অবাধ প্রবেশ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন প্রবেশের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্যানোপির প্রবেশমুখে আনসার ও এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে যাত্রী ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর যাচাইয়ের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কে যাত্রীর স্বজন আর কে অন্য উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে এসেছেন, তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ক্যানোপির ভেতরে যাত্রীদের স্বজনদের পাশাপাশি গাড়ির দালাল, সিএনজি চালক এবং কৌতূহলী দর্শনার্থীদেরও অবস্থান করতে দেখা গেছে। অনেকেই কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ বা দৃশ্যমান বাধা ছাড়াই ভেতরে প্রবেশ ও বের হচ্ছেন।
সোলাইমান নামে এক সিএনজি চালক জানান, তিনি প্রায় প্রতিদিন বিমানবন্দরে যাত্রী খুঁজতে আসেন। তার দাবি, ক্যানোপিতে প্রবেশের সময় তাকে কেউ বাধা দেয় না।
অন্যদিকে আমির হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, ট্রেনে রাজশাহী যাওয়ার আগে হাতে সময় থাকায় তিনি বিমানবন্দর দেখতে এসেছেন। ক্যানোপিতে প্রবেশের সময় তাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেননি বলেও জানান তিনি।
এ দুটি ঘটনাই প্রশ্ন তুলছে—আগত যাত্রী ও তাদের স্বজনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় কারা প্রবেশ করছেন, তা কতটা কার্যকরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
সরেজমিনে অনেক প্রবাসী যাত্রীকে নিতে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচজন স্বজনকেও ক্যানোপিতে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
লক্ষ্মীপুর থেকে আসা আব্দুল্লাহ তার ছেলে দেশে ফিরবেন বলে স্ত্রী, দুই সন্তান ও এক প্রতিবেশীকে নিয়ে সকাল থেকেই ক্যানোপিতে অপেক্ষা করছিলেন। একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন ক্যানোপিতে প্রবেশ করতে পারবেন—এমন নিয়ম সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না বলে জানান তিনি।
অতিরিক্ত স্বজনের উপস্থিতি শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, এতে ক্যানোপিতে ভিড় বাড়ে এবং আগত যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচলেও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নির্দেশনা দিয়ে জানিয়েছিল, আগত বা বহির্গামী প্রতিটি যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন সঙ্গী ডিপারচার ড্রাইভওয়ে ও অ্যারাইভাল ক্যানোপিতে প্রবেশ করতে পারবেন।
যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক রাখা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর সামনেই একজন যাত্রীর সঙ্গে তিন-চারজন কিংবা তারও বেশি স্বজন ক্যানোপিতে প্রবেশ করছেন। ফলে বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে সেখানে অতিরিক্ত লোকসমাগম তৈরি হচ্ছে।
বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, একজন যাত্রীকে গ্রহণ করতে পরিবারের একজন সদস্য ক্যানোপির ভেতরে গেলেই যথেষ্ট। কিন্তু দলবেঁধে মানুষের প্রবেশ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাদের মতে, ক্যানোপির প্রবেশমুখে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের নিয়ম বাস্তবায়নে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেকেই নিয়ম মানতে চান না। দুজনের বেশি স্বজনকে প্রবেশে বাধা দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রী বা তাদের স্বজনরা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কিংবা হুমকিমূলক আচরণ করেন। এতে মাঠপর্যায়ে নিয়ম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা যত শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে।
তার মতে, ক্যানোপি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা। ফলে সেখানে অপ্রয়োজনীয় লোকসমাগম কোনোভাবেই কাম্য নয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ক্যানোপির ভেতরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রবেশ না করতে জনসাধারণকে নিয়মিত অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই নির্দেশনা মানতে চান না।
তার মতে, সবাই সচেতন না হলে শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধান করা কঠিন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল বলেন, ক্যানোপির গেটে নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের উপস্থিতিতে কীভাবে এত মানুষ ভেতরে প্রবেশ করছেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ বশির উদ্দীন বলেন, বিমানবন্দর এলাকায় ভবঘুরে, ভিক্ষুক, ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পাশাপাশি একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন প্রবেশের নিয়ম বাস্তবায়নেরও চেষ্টা চলছে। ক্যানোপিতে অনাকাঙ্ক্ষিত লোকসমাগমের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; যাত্রী ও তাদের স্বজনদেরও নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। তবে একই সঙ্গে প্রবেশমুখে নিয়মের ধারাবাহিক ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাত্রীদের স্বজন এবং সাধারণ দর্শনার্থী, দালাল বা যাত্রী সংগ্রহে আসা পরিবহনচালকদের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্যানোপির অপ্রয়োজনীয় ভিড় কমানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সূত্র: সরেজমিন পর্যবেক্ষণ
মন্তব্য করুন