aviation
প্রকাশিত: 6 October 2026, 11:26:12 Am
অনলাইন সংস্করণ

বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা কি এপিবিএনের অবহেলায়?

এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে যাত্রী ও স্বজনদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, সিএনজি চালক ও গাড়ির দালালদের দৌরাত্ম্য, এলোমেলো গাড়ি পার্কিং এবং অতিরিক্ত লোকসমাগমে প্রায়ই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের প্রবেশপথে থাকা এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) চেকপোস্টে নজরদারি ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৭ আগস্ট বিমানবন্দর নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় উপস্থাপিত একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এপিবিএনের দায়িত্ব পালনে ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজনের ক্যানোপি এলাকায় প্রবেশের সুযোগ থাকলেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ জন পর্যন্ত প্রবেশ করছেন। এতে ক্যানোপিতে অতিরিক্ত লোকসমাগমের পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় কমিটির সভায় এসব সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু সুপারিশ ও নির্দেশনা দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এরপরও বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।

চেকপোস্টের নজরদারি নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রশ্ন

বেবিচক সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই সভায় উপস্থাপিত গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়, বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে এপিবিএনের একাধিক নিরাপত্তা চৌকি রয়েছে।

বিমানবন্দরে প্রবেশকারী সাধারণ যাত্রী, দর্শনার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকলেও সব ক্ষেত্রে সেটি যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এর ফলে যাত্রীর স্বজনদের পাশাপাশি বহিরাগত ও অনুমোদনহীন ব্যক্তিদেরও বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন নিরাপত্তা উদ্বেগ উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

বেবিচকের নিজস্ব গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও বিমানবন্দরের ল্যান্ডসাইডে ট্রাফিক জ্যাম, ক্যানোপিতে অনিয়ন্ত্রিত লোকসমাগম, ভিক্ষুকের উপস্থিতি এবং অবৈধ লাগেজ র‍্যাপারদের হয়রানির বিষয় তুলে ধরা হয়।

সভা থেকে এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং ল্যান্ডসাইডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সরেজমিনেও অতিরিক্ত স্বজনের উপস্থিতি

নির্দেশনার পর বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অনেক যাত্রীর সঙ্গে একাধিক স্বজন এখনো ক্যানোপি এলাকায় প্রবেশ করছেন।

কোথাও তিন থেকে চারজন, আবার কোথাও তারও বেশি মানুষকে একজন যাত্রীকে বিদায় জানাতে বা অভ্যর্থনা জানাতে ক্যানোপিতে অবস্থান করতে দেখা যায়।

অনেক যাত্রী ও স্বজনের ভাষ্য, একজন যাত্রীর সঙ্গে কতজন ক্যানোপি এলাকায় যেতে পারবেন—এমন কোনো বিধিনিষেধ সম্পর্কে তারা জানতেন না। ফলে পরিবার ও পরিচিতজনদের নিয়ে বিমানবন্দরে আসছেন অনেকে।

বিশেষ করে ফ্লাইট অবতরণের সময় আগমনী ক্যানোপিতে স্বজনদের ভিড় বেড়ে গেলে যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল এবং গাড়িতে ওঠার প্রক্রিয়াতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

সিএনজি ও গাড়ির বিশৃঙ্খলায় বাড়ছে ভোগান্তি

শুধু অতিরিক্ত লোকসমাগম নয়, বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির এলোমেলো অবস্থানও যাত্রীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

যাত্রী নামানোর পর দ্রুত এলাকা ত্যাগ করার পরিবর্তে কিছু সিএনজিকে ক্যানোপির আশপাশে অবস্থান করে নতুন যাত্রী খুঁজতে দেখা যায়। কোনো কোনো চালক সরাসরি যাত্রী ডেকে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন।

একইভাবে আগমনী এলাকায় যাত্রী নিতে আসা কিছু গাড়ি নির্ধারিতভাবে অবস্থান না করায় যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে যাত্রী ধরতে পরিবহনচালকদের ডাকাডাকি যুক্ত হয়ে বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনের পরিবেশ আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে।

এপিবিএন বলছে, প্রতিটি গাড়ি তল্লাশিতে লাগে ৪–৫ মিনিট

অভিযোগের বিষয়ে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন প্রবেশের নিয়ম বাস্তবায়নে তারা চেষ্টা করছেন।

তবে প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করতে প্রায় চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। এতে পেছনে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক গাড়িতে নারী ও বয়স্ক যাত্রী থাকায় বাস্তব পরিস্থিতিতে তল্লাশি ও যান চলাচলের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও সামনে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও জানান, বিমানবন্দরের আশপাশে উপদ্রব সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হয় এবং তাদের আটক করা হয়।

‘অতিরিক্ত লোক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা দুটিই বিঘ্নিত করতে পারে’

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, যাত্রীকে বিদায় জানাতে বা অভ্যর্থনা জানাতে স্বজনদের বিমানবন্দরে আসা স্বাভাবিক। তবে একজন যাত্রীর সঙ্গে একসঙ্গে অতিরিক্ত মানুষ ক্যানোপিতে প্রবেশ করলে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা—দুটিই বিঘ্নিত হতে পারে।

বিশেষ করে নিয়ন্ত্রিত বা সংবেদনশীল এলাকায় কারা প্রবেশ করছেন, সেটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বিমানবন্দর নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন তিনি।

বেবিচক বলছে, নিরাপত্তায় ছাড় নয়

বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল বলেন, বিমানবন্দর নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো ঘাটতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।

নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ল্যান্ডসাইড বা বহিরাঙ্গন এয়ারসাইডের মতো একই মাত্রার নিয়ন্ত্রিত এলাকা না হলেও এখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী, স্বজন, যানবাহন ও বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষ চলাচল করেন। ফলে এ অংশের শৃঙ্খলা সরাসরি যাত্রীসেবা ও সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।

একদিকে প্রতিটি গাড়ি ও ব্যক্তিকে যাচাই করতে গিয়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি না করা, অন্যদিকে অননুমোদিত ব্যক্তি ও অপ্রয়োজনীয় লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণ—দুই বিষয়ই সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ জন্য যাত্রীপ্রতি স্বজনের সংখ্যা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ, নিয়মটি দৃশ্যমানভাবে প্রচার, সিএনজি ও অন্যান্য গাড়ির নির্ধারিত অবস্থান নিশ্চিত করা, দালাল ও উপদ্রব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা এবং প্রবেশপথের নিরাপত্তা নজরদারি জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় কমিটির সভায় সমস্যা চিহ্নিত এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন সেই নির্দেশনা বিমানবন্দরের প্রবেশপথ ও ক্যানোপিতে বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: বিমানবন্দর নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় উপস্থাপিত গোয়েন্দা প্রতিবেদন, বেবিচক, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় চূড়ান্ত নেগোশিয়েশন শুরু আজ, আলোচনা

1

২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরে রেকর্ড ৯৮০ কোটি যাত্রী

2

শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের কর্মীর কাছ থেকে ১ কেজির বেশি স্

3

দুবাই-আবুধাবিতে ফ্লাইটে বিলম্ব ও বাতিল, যাত্রীদের স্ট্যাটাস

4

উড়োজাহাজে ঘুমন্ত যাত্রীর মাথায় ধাতব পানির বোতল, ব্রিটিশ এয়ার

5

বিমানের ভেতরেই বারবার মিলছে স্বর্ণের চালান, নজরদারিতে ‘সংরক্

6

বিমানে Lithium Battery কেন Checked Baggage-এ ঝুঁকিপূর্ণ? যাত

7

শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালে আরও প্রয়োজন ৯০২ কোটি টাকা, যেসব

8

চাকরি স্থায়ীকরণ ও ইনক্রিমেন্টের দাবিতে বেবিচক কর্মকর্তা-কর্

9

সৌদি বিমানবন্দরে হামলা: রিয়াদ ও দাম্মাম রুটে বিমানের ফ্লাইট

10

রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলা, টার্মিনাল-৪-এ আগু

11

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার একাধিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ

12

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সংকট, কয়েকটি

13

শাহজালালে প্রায় ৩৯৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার, মোবাইল ও ল্যাপটপসহ ত

14

জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটি (NCASC) পুনর্গঠন

15

২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা–রিয়াদ–ঢাকা রুটের ফ্লাইট বাতিল করল ইউ

16

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ২৫ এজেন্সির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বায়রার একাং

17

বৈরী আবহাওয়া ও জনবল সংকটে নিউইয়র্কের চার বিমানবন্দরে ফ্লাইটে

18

রানওয়ে নিরাপত্তায় ৯ কোটি টাকায় আধুনিক সুইপার কিনছে বেবিচক

19

মায়ামি বিমানবন্দরে অ্যামাজনের কার্গো বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৫

20