কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ের পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পর্যটন অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, নগর ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবা—সবকিছুকে একটি পরিকল্পনার আওতায় আনার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই সঙ্গে কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা, মেরিন ড্রাইভে পর্যটকদের জন্য নতুন সুবিধা তৈরি এবং ব্লু ইকোনমিকে কেন্দ্র করে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের বিভিন্ন প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে কক্সবাজার জেলার ভবিষ্যৎ সমন্বিত উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, সমন্বিত উন্নয়ন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন পদ্ধতির মাধ্যমে কক্সবাজারকে একটি বড় পর্যটন হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এ লক্ষ্যে কক্সবাজারে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মালিকানাধীন হোটেলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম মডেল অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব গড়ে তুলতে শুধু হোটেল বা বিনোদনকেন্দ্র বাড়ানো যথেষ্ট নয়। পর্যটকের সহজ যাতায়াত, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৈকতের পরিবেশ সংরক্ষণ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণপরিবহন এবং ডিজিটাল পর্যটন তথ্য—সবগুলো বিষয়কে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনা প্রয়োজন।
কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনার সঙ্গে বিমানবন্দরের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এর আগে এপ্রিলে জাতীয় সংসদে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছিলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে এবং প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও উপযুক্ততা যাচাইয়ের কাজ করা হয়েছে। তিনি কয়েক মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা হয়ে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিবর্তনের পরিবর্তে সরাসরি কক্সবাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে—তবে সেটি নির্ভর করবে কোন কোন আন্তর্জাতিক রুট চালু হয় এবং এয়ারলাইনগুলোর বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর।
বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছাকাছি গন্তব্যগুলোর সঙ্গে কার্যকর বিমান যোগাযোগ তৈরি করা গেলে কক্সবাজারকে আঞ্চলিক পর্যটন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কক্সবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করলেই বিদেশি পর্যটক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি গন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক হতে হলে সহজ ভিসা, আন্তর্জাতিক বিপণন, মানসম্মত হোটেল, নির্ভরযোগ্য স্থানীয় পরিবহন, পর্যটক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ডিজিটাল পেমেন্ট, দক্ষ ট্যুর গাইড এবং আকর্ষণীয় পর্যটন অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
এ কারণে বিমানবন্দরকে বৃহত্তর tourism ecosystem-এর একটি অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
সভায় কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন স্থানে Visitor Point তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ নিজেই পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণ। পরিকল্পিত viewpoint, নিরাপদ parking, washroom, পর্যটন তথ্য, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের ব্যবস্থা যুক্ত করা গেলে মেরিন ড্রাইভের পর্যটন অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে এ ধরনের স্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রে পাহাড়, সমুদ্রসৈকত এবং স্থানীয় প্রতিবেশের ওপর প্রভাব মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সমুদ্রসম্পদকেন্দ্রিক Blue Economy-কেও যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ব্লু ইকোনমি ও সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান কক্সবাজারে আনার বিষয়টি পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে কক্সবাজারকে শুধু সমুদ্রসৈকতনির্ভর পর্যটন শহর হিসেবে নয়, সামুদ্রিক অর্থনীতি, শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবেও বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমন্বিত পরিকল্পনায় কক্সবাজারকে আধুনিক ও ডিজিটাল পর্যটন নগরীতে রূপ দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, পর্যটন, যোগাযোগ, নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করে পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
পর্যটনের ক্ষেত্রে ‘Smart City’ ধারণা কার্যকর করতে অনলাইন tourist information, ডিজিটাল টিকিটিং, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জরুরি সহায়তা, পর্যটক নিরাপত্তা এবং real-time transport information-এর মতো সেবা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তি শুধু পর্যটকের অভিজ্ঞতা উন্নত করে না; স্থানীয় প্রশাসনের জন্য পর্যটকের চাপ ও নগরসেবা ব্যবস্থাপনাও সহজ করতে পারে।
কক্সবাজারে বড় আকারের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য।
হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সৈকত, পাহাড়, বন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় প্রতিবেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে। সভা শেষে পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছে।
তাই ‘আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব’ তৈরির ক্ষেত্রে অবকাঠামো বৃদ্ধির পাশাপাশি carrying capacity, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় পরিবেশ এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কক্সবাজার শহরের বাইরের পর্যটন সম্পদকেও যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি, ইনানী এবং টেকনাফসহ আশপাশের পর্যটন এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা গেলে একজন পর্যটকের অবস্থানের সময় বাড়তে পারে। এতে হোটেলের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন, খাবার, গাইড, হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এক্ষেত্রে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, একজন পর্যটক কত দিন অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা ব্যয় করছেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনায় বিমানবন্দর, হোটেল, মেরিন ড্রাইভ, স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনা, ব্লু ইকোনমি ও ইকো-ট্যুরিজম—বিভিন্ন বিষয় একই সঙ্গে সামনে এসেছে।
তবে এগুলোর অনেকগুলোই এখনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাবের পর্যায়ে। ফলে নতুন মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়া, প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের পরই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পিত নগরায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, পর্যটক নিরাপত্তা এবং মানসম্মত সেবাকে সমন্বিত করা গেলে কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ২৩ জুলাইয়ের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বৈঠক এবং প্রকাশিত সরকারি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য
মন্তব্য করুন