এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি গ্রহণে ব্যবহৃত সনদের সত্যতা, পদোন্নতি ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে তদন্তের মধ্যে থাকা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে বদলি করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) জারি করা এক প্রশাসনিক আদেশে তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে এরোড্রোম স্ট্যান্ডার্ড, এফএস অ্যান্ড আর (Aerodrome Standard, FS&R) বিভাগের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
বদলির আদেশে বেবিচকের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) তিরান আহমেদ সই করেছেন। বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এই বদলি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের শাস্তি হিসেবে দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। প্রশাসনিক বদলি নিজে থেকে কোনো অভিযোগ প্রমাণের বিষয়ও নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধায় চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। সম্প্রতি তার চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পিতার মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এরপর বেবিচকের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ একাধিক সংস্থা বিষয়টি যাচাই শুরু করে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সনদকে নিশ্চিতভাবে ‘ভুয়া’ হিসেবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়। সনদটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বৈধভাবে ইস্যু হয়েছিল কি না, চাকরিতে সেটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা কী—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শুধু মুক্তিযোদ্ধা সনদ নয়, শরিফুল ইসলামের চাকরিতে প্রবেশ এবং পরবর্তী সময়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াও পর্যালোচনায় এসেছে।
কোনো কোটা বা বিশেষ সুবিধার ভিত্তিতে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্রের সত্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি তদন্তে কোনো নথি জাল বা অসত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট চাকরির সুবিধা কীভাবে পাওয়া হয়েছিল এবং যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যত্যয় ছিল কি না—সেটিও প্রশাসনিক ও আইনগত পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
তবে শরিফুল ইসলামের ক্ষেত্রে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্ত ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সংশ্লিষ্ট একটি মামলার বিষয়েও তার নাম আলোচনায় এসেছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
তবে মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, বর্তমান বিচারিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নথি ছাড়া তাকে কোনো আর্থিক অনিয়মের জন্য দায়ী হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
অভিযোগ, তদন্ত বা মামলা থাকা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া আইনগতভাবে এক বিষয় নয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেবিচকের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবি ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সে সময় শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়টি এসেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং চাকরির ক্ষেত্রে আইন বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ এক বিষয় নয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট বিধিভঙ্গ বা অপরাধের তথ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
ফলে শরিফুল ইসলামকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে Aerodrome Standard, FS&R বিভাগের পরিচালক হিসেবে বদলি করার বিষয়টিকে তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য হিসেবে দেখা যাবে না।
একইভাবে নতুন পদে বদলি করা হয়েছে বলেও তার বিরুদ্ধে চলমান কোনো তদন্তের নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
তদন্তকারী সংস্থা বা বেবিচক আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের ফল প্রকাশ করলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হবে।
একটি দেশের বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও পরিচালন মান বজায় রাখতে aerodrome standards গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
Runway, taxiway, apron, airfield facilities, operational safety এবং Rescue and Fire Fighting-এর মতো বিষয় বিমানবন্দরের নিরাপদ পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বেবিচকের মতো বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় standards ও regulatory requirements বাস্তবায়ন এবং তদারকির সঙ্গে যুক্ত।
ফলে এ ধরনের বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক জবাবদিহি, পেশাগত যোগ্যতা এবং নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব পালনের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ।
শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমানে যেসব বিষয় আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চাকরিতে ব্যবহৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা, নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়।
এসব অভিযোগের কোনটি প্রমাণিত, কোনটি প্রমাণিত নয় এবং কোনো ক্ষেত্রে বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নির্ধারণ করা সম্ভব।
বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা সনদের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মূল নথি, সরকারি রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করাই গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত; এগুলো এখনো প্রমাণিত অপরাধ নয়।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)
মন্তব্য করুন