aviation
প্রকাশিত: 29 September 2026, 9:54:20 Am
অনলাইন সংস্করণ

দীর্ঘদিনের পাইলট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তদন্তের দাবি এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে প্রশিক্ষিত পাইলটের চাহিদা বাড়তে থাকার মধ্যেই প্রায় আট দশকের পুরোনো বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি অ্যান্ড জেনারেল এভিয়েশন লিমিটেডের (BFA&GA) কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থসংকট ও উড্ডয়নযোগ্য প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজের অভাবে গত জুন থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় কী কারণে দেশের সবচেয়ে পুরোনো পাইলট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাল, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় কার্যকর করার সম্ভাবনা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির যাত্রা শুরু ১৯৪৮ সালে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) নথিতেও প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের প্রথম Approved Training Organization (ATO) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে Private Pilot Licence (PPL), Commercial Pilot Licence (CPL), Instrument Rating (IR) ও Flight Instructor Rating-এর মতো প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থসংকটে জুন থেকে বন্ধ প্রশিক্ষণ

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ দিকে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি বেবিচককে তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিষয়টি জানায়। একাডেমির পক্ষ থেকে অর্থসংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় airworthy aircraft না থাকার বিষয়টিও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত flight training বন্ধ রয়েছে। ফলে সেখানে প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আগস্টে একাডেমির শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদনও করা হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আর্থিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়।

‘কেন বন্ধ হলো, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন’

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির মতো দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তার মতে, একটি flying academy শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; দেশের ভবিষ্যৎ বৈমানিক তৈরির অবকাঠামোরও অংশ। বিশেষ করে দেশের aviation sector সম্প্রসারণের সঙ্গে যখন প্রশিক্ষিত পাইলটের প্রয়োজন বাড়ছে, তখন বিদ্যমান প্রশিক্ষণ সক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা হয়েছিল, পরিচালনা কাঠামোর প্রয়োজনীয় সভা বা Extraordinary General Meeting (EGM) হয়েছিল কি না এবং আর্থিক সংকট কীভাবে তৈরি হয়েছে—এসব বিষয় স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

শিক্ষার্থী-কর্মীদেরও বেবিচকে আবেদন

বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শুধু এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরাই নন, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন।

গত ৪ আগস্ট শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে ‘Urgent Intervention Regarding the Current Situation of Bangladesh Flying Academy’ শীর্ষক একটি আবেদন দেওয়া হয়।

সেখানে temporary closure-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই সঙ্গে বকেয়া বেতন, শিক্ষার্থীদের অর্থ ফেরত এবং দীর্ঘ সময়েও কিছু শিক্ষার্থীর flight training শেষ না হওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দেশের প্রথম অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একটি

বাংলাদেশের aviation history-তে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

বেবিচকের Aircraft Accident Investigation Committee-এর একটি সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি আগে ‘Flying Club’ নামে পরিচিত ছিল এবং ১৯৪৮ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই প্রতিবেদনে এটিকে বাংলাদেশের প্রথম CAAB Approved Training Organization হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেবিচকের Personnel Licensing Handbook-এ Bangladesh Flying Academy-এর অনুমোদিত প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে—

  • Private Pilot Licence Course

  • Commercial Pilot Licence Course

  • Instrument Rating Course

  • Flight Instructor Rating Course

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে অর্জিত pilot licence conversion-এর জন্যও প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছে।

দীর্ঘ কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া বহু পাইলট দেশের বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন খাতে যুক্ত হয়েছেন।

উড়োজাহাজ সংকট বড় বাধা

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে training aircraft-এর প্রাপ্যতা।

প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, একাডেমির হাতে থাকা প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজগুলোর operational availability কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নিয়মিত flight training পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি Cessna প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজের propeller-সংক্রান্ত সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।

একাডেমি পুনরায় কার্যকর করতে নতুন প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রস্তাবও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের হিসাবে, দুটি training aircraft সংগ্রহসহ প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে স্বাধীন আর্থিক ও কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শুধু উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত maintenance, spare parts, insurance, fuel, instructor availability এবং CAAB-এর airworthiness ও training requirements পূরণ করাও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য।

আগেও উঠে এসেছিল ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার দুর্বলতা

বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতীতের regulatory findings-ও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২০ সালের একটি Cessna-152 দুর্ঘটনার তদন্তে প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনে একাডেমির operational management-কে একটি ATO-এর জন্য অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে quality control দুর্বল এবং Safety Management System-এর ঘাটতির কথাও উঠে আসে।

এসব পর্যবেক্ষণ বর্তমান বন্ধ হওয়ার সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না। তবে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি governance, safety management, quality assurance এবং professional management-এর বিষয়গুলোও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখায়।

পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগে উঠছে একাধিক প্রস্তাব

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বের করে আনতে একাডেমির কয়েকজন life member Emergency General Meeting আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিচালনা কাঠামো পুনর্বিন্যাস, নতুন নির্বাচন, পেশাদার CEO-নির্ভর ব্যবস্থাপনা, সম্পদের বিষয়ে পর্যালোচনা এবং নতুন বিনিয়োগের ব্যবস্থা। সরকারি বা নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে একজন administrator নিয়োগের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।

তবে একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান হওয়াই পুনরুজ্জীবনের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। নতুন করে কার্যক্রম শুরুর আগে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা, governance, aircraft availability, safety system এবং দীর্ঘমেয়াদি business sustainability যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাইলট প্রশিক্ষণ সক্ষমতার প্রশ্ন

বাংলাদেশের aviation sector-এ নতুন উড়োজাহাজ, বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক রুট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে cockpit crew-এর প্রয়োজনও বাড়বে। দেশীয় প্রশিক্ষণ সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে ভবিষ্যৎ পাইলটদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

একটি কার্যকর flying academy গড়ে তুলতেও শুধু classroom training যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ, qualified flight instructor, maintenance capability, পর্যাপ্ত flying hours, airspace ও airport access এবং শক্তিশালী safety oversight—সবগুলো উপাদান একসঙ্গে প্রয়োজন।

এ কারণে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট হিসেবে না দেখে দেশের দীর্ঘমেয়াদি pilot-training capacity-এর প্রেক্ষাপটেও মূল্যায়নের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রায় ৭৮ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করা সম্ভব কি না, তা নির্ধারণের আগে এর আর্থিক ও প্রশাসনিক অবস্থা, সম্পদ, দায়, প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং regulatory compliance-এর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কেন প্রতিষ্ঠানটি এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাল, সেটিও স্বচ্ছভাবে অনুসন্ধান করা হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য পাইলট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত শিক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), Bangladesh Flying Academy & General Aviation Ltd.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শাহজালাল বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছ

1

বারাণসী বিমানবন্দরে যাত্রীর পিস্তল থেকে গুলি, নিরাপত্তারক্ষী

2

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে দুবাইফেরত যাত্রীর ব্যাগেজে প্রায় ৬ লাখ

3

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বেবিচকের নিয়োগ পরীক্ষা, ওএমআর কার্যক

4

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরে জাপানের সহযোগিতা চ

5

বিশেষ ফ্লাইটে লিবিয়া থেকে ফিরছেন আরও ৩০০ বাংলাদেশি

6

সমুদ্রের নিচে বোয়িং ৭৪৭, বাহরাইনে উড়োজাহাজই এখন ডাইভিং আকর্ষ

7

১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল আংশিক চালুর লক্ষ্য, বেবিচক চেয়ার

8

৯/১১ হামলার ২৫ বছর: বৈশ্বিক বিমান নিরাপত্তা জোরদারে নতুন অঙ্

9

AirAsia-এর অর্থসংকটে সরকারি সহায়তা নিয়ে আলোচনা

10

কলকাতা বিমানবন্দরের এটিসি ভবনে আগুন, ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক

11

প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ফ্লাইট, বছরে ১ কোটি ২৫ লাখ যাত্রী—শাহজালা

12

প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণ বিমানমন্ত্রী হলেন এম. রশিদুজ্জামান ম

13

দুবাই-আবুধাবিতে ফ্লাইটে বিলম্ব ও বাতিল, যাত্রীদের স্ট্যাটাস

14

দেশের সব বিমানবন্দরে ‘এভিয়েশন সিকিউরিটি উইক’ পালন করছে বেবিচ

15

ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টে নতুন সিদ্ধান্ত, একসঙ্গে মিলবে

16

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরক

17

১২ অক্টোবর রাত ৩টা পর্যন্ত বন্ধ রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

18

মাদক পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ এয়ার ইন্ডিয়ার আরও দুই পাইল

19

বিমানের কাছে বেবিচকের পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা, বকেয়া আদা

20