এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলো ২০২৫ সালে শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যাত্রী ও কার্গো পরিবহনে চাহিদা বৃদ্ধি এবং জ্বালানির দাম কমে যাওয়ায় অঞ্চলটির ২৭টি সদস্য এয়ারলাইনের সম্মিলিত পরিচালন মুনাফা (Operating Profit) এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এই মুনাফার পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
এশিয়া প্যাসিফিক এয়ারলাইন্স অ্যাসোসিয়েশনের (AAPA) প্রকাশিত প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সদস্য এয়ারলাইনগুলোর মোট পরিচালন আয় (Operating Revenue) ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে পরিচালন ব্যয়ও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২০৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যয় বাড়লেও জেট ফুয়েলের মূল্য কমে যাওয়ায় এয়ারলাইনগুলোর মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৫ সালে যাত্রী পরিবহন থেকে আয় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ১৭৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে রেভিনিউ প্যাসেঞ্জার কিলোমিটার (RPK) হিসেবে যাত্রী চাহিদা ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট এবং এশিয়ার অভ্যন্তরীণ রুট—উভয় ক্ষেত্রেই যাত্রী চাহিদা শক্তিশালী ছিল। তবে আসনসংখ্যা দ্রুত বাড়ায় গড় ভাড়া বা যাত্রী আয় (Yield) ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আরপিকে ৭ দশমিক ৮ মার্কিন সেন্টে নেমে এসেছে।
কার্গো পরিবহনেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে কার্গো থেকে আয় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে ফ্রেইট টন কিলোমিটার (FTK) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্ভাব্য শুল্ক বৃদ্ধি কার্যকরের আগে অনেক প্রতিষ্ঠান আগাম পণ্য পরিবহন করায় কার্গো বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হলেও গড় কার্গো ভাড়া ২ শতাংশ কমে প্রতি এফটিকেতে ৩২ দশমিক ১ মার্কিন সেন্টে নেমে এসেছে।
জ্বালানির দাম কমে যাওয়ায় এয়ারলাইনগুলো বড় ধরনের স্বস্তি পেয়েছে। ২০২৫ সালে জ্বালানি ব্যয় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৫৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বছরজুড়ে জেট ফুয়েলের গড় মূল্য ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৮ দশমিক ৮ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ কম। ফলে মোট পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে জ্বালানির অংশ ৩০ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে কর্মী ব্যয়, উড়োজাহাজ লিজ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিমানবন্দর চার্জ বৃদ্ধির কারণে জ্বালানি ছাড়া অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ জ্বালানির খরচ কমলেও সরবরাহ ব্যবস্থা ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এএপিএর মহাপরিচালক ওয়ং হং বলেন, ২০২৫ সালে শক্তিশালী যাত্রী ও কার্গো চাহিদার কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলো ভালো অবস্থানে ছিল। তবে চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং তেলের বাজারের অস্থিরতার কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। তার মতে, জ্বালানির মূল্য আরও বাড়তে পারে, যা এয়ারলাইনগুলোর সবচেয়ে বড় ব্যয় হিসেবে আবারও চাপ সৃষ্টি করবে।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক এয়ারলাইন শিল্পের মুনাফার পূর্বাভাস ৪১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ২৩ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে। ইরান-সংক্রান্ত অস্থিরতার পর জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় এই পূর্বাভাস সংশোধন করা হয়েছে। আইএটিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এয়ারলাইনগুলোর মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ জ্বালানি খাতে ব্যয় হবে।
এরই মধ্যে জাপানের এএনএ (ANA) ও **জাপান এয়ারলাইন্স (JAL)**সহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন জ্বালানি সারচার্জ বাড়িয়েছে। ফলে চলতি বছর অঞ্চলে বিমান ভাড়া কমার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। যাত্রী ও কার্গো বাজারও স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলো নতুন রুট ও সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।
মন্তব্য করুন