এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, বৈধ কর্মজীবী ও পারিবারিক ভিসাপ্রত্যাশীদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে মানব পাচার, অনিয়মিত অভিবাসন এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার জানিয়েছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম।
গত ৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির জননিরাপত্তাবিষয়ক উপমন্ত্রী সিনিয়র লেফটেন্যান্ট জেনারেল নগুয়েন ভ্যান লং।
বৈঠকে দুই দেশের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ভিয়েতনামে বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিয়েতনামের ভিসা পেতে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি প্রকৃত বাংলাদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, বৈধভাবে কর্মরত পেশাজীবী এবং পারিবারিক কারণে ভিয়েতনাম যেতে আগ্রহীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ ও শিথিল করার অনুরোধ জানান।
ভিয়েতনাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ব্যবসায়িক গন্তব্যগুলোর একটি। বাংলাদেশ থেকেও পর্যটন, ব্যবসা ও পেশাগত কাজে দেশটিতে যাতায়াত রয়েছে।
ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হলে দুই দেশের মধ্যে বৈধ যাত্রী চলাচল এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বৈঠকে ভিসা সহজ করার অনুরোধ জানানো হলেও বাংলাদেশিদের জন্য নতুন কোনো ভিসা সুবিধা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে—এমন ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ভিয়েতনামে অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে ভিয়েতনাম সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন।
অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও জাতীয়তা যাচাই, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি প্রস্তুত এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে এ ধরনের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুধু বিমান টিকিট দিয়ে দেশে পাঠানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে কনস্যুলার, আইনগত এবং প্রশাসনিক একাধিক প্রক্রিয়া যুক্ত থাকে।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ।
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানব পাচার, মাদক চোরাচালান এবং অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
মানব পাচারের ক্ষেত্রে একাধিক দেশের অপরাধী চক্র যুক্ত থাকতে পারে। ফলে তথ্য বিনিময়, সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণ এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
ভিয়েতনামে চাকরি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য বৈঠকের আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন ভিসা বা অন্য কোনো ভিসা ব্যবহার করে অনুমোদনহীনভাবে কাজ করা কিংবা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কোনো দেশে অবস্থান করলে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইনের আওতায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
একইভাবে বিদেশে চাকরি দেওয়ার কথা বলে কোনো দালাল বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভ্রমণের ব্যবস্থা করলে মানব পাচার বা অনিয়মিত অভিবাসনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
তাই ভিয়েতনামে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে চাকরির বৈধতা, নিয়োগকর্তা, প্রয়োজনীয় ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটসহ সংশ্লিষ্ট নথি আগে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমান টিকিট থাকাই কোনো দেশে প্রবেশের নিশ্চয়তা নয়। গন্তব্য দেশের বৈধ ভিসা ও প্রয়োজনীয় immigration requirements পূরণ করতে হয়।
বিশেষ করে পর্যটন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের জন্য ভিসার ধরন আলাদা হতে পারে। ফলে যে উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ভিসা সেই উদ্দেশ্যের জন্য বৈধ কি না—যাত্রার আগেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অন্যথায় গন্তব্য দেশের বিমানবন্দরে immigration clearance-এর সময় জটিলতা, প্রবেশ প্রত্যাখ্যান কিংবা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদল।
একই সঙ্গে আন্তঃদেশীয় অপরাধ প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে দেশটি।
দুই পক্ষ নিরাপত্তা ও অভিবাসনের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা করেছে।
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বেড়েছে।
নিউইয়র্কের বৈঠকে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার যে অনুরোধ জানানো হয়েছে, সেটি এখন ভিয়েতনামের বিবেচনার বিষয়। ফলে ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন কোনো সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে কার্যকর ভিসা ও অভিবাসন বিধিই অনুসরণ করতে হবে।
সূত্র: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন
মন্তব্য করুন