
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড গত ১ নভেম্বর থেকে নতুন বিদ্যুৎ মূল্য কার্যকর করেছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গুনতে হবে ৬২ টাকা।
বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
এর আগে গত ২১ অক্টোবর ইউরো-বাংলা রিসোর্টের সামনে মানববন্ধন করেন দ্বীপের দেড় শতাধিক বিদ্যুৎ গ্রাহক। তাঁরা বিদ্যুতের মূল্য কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও হোটেল মালিকদের অভিযোগ, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য উচ্চমূল্য পরিশোধ করলেও দিনে মাত্র তিন ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের মিটারে দেখানো ব্যবহার ও বিলের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিনে প্রায় ২৩০টি হোটেল ও ২০০টি রেস্তোরাঁ রয়েছে। পর্যটন মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের চাহিদা ৬০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অথচ দ্বীপের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্তমানে মাত্র ১৩৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
ফলে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
ব্লু মেরিন এনার্জি জানিয়েছে, মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপে ডিজেল পরিবহনের উচ্চ ব্যয়, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ চুরি এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
এ ছাড়া ব্যাটারি প্রতিস্থাপনের জন্য চীন থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আসার অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা পূরণে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁদের আশঙ্কা, ডিজেল জেনারেটরের শব্দদূষণ সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দ্বীপের সৈকতে ডিম পাড়তে আসা সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাড়ে চার মাসের পর্যটন মৌসুমে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চলাচলে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে।
এদিকে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারি সহায়তায় একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত হোটেল ও রিসোর্টের কক্ষভাড়া এবং পর্যটকদের অন্যান্য সেবার খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সেন্ট মার্টিনের পর্যটন অর্থনীতি সচল রাখা এবং পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।