
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
উড়োজাহাজের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের কম দাম এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আর্থিক চাপে পড়েছে চীনের তিন বৃহৎ বিমান সংস্থা। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এয়ার চায়না, চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স ও চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের আর্থিক ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ফলে ২০২৬ সাল শেষে তিনটি প্রতিষ্ঠানই লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
আর্থিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এলএসইজি (LSEG) সংকলিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, এয়ার চায়না ও চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স করোনা মহামারির পর টানা সপ্তম বছরের মতো নিট লোকসানের পথে রয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৯ সালের পর প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে মুনাফায় ফেরা চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সও চলতি বছর আবার লোকসানে পড়তে পারে।
চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে এয়ার চায়নার নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৬ লাখ চীনা ইউয়ান, যা প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।
একই সময়ে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের নিট মুনাফা কমেছে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় প্রান্তিকে মাত্র ৬ কোটি ৪০ লাখ ইউয়ান মুনাফা করেছে।
অন্যদিকে চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স তৃতীয় প্রান্তিকে ৬০ কোটি ৯০ লাখ ইউয়ান নিট লোকসান করেছে।
অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৩৮৪ কোটি ইউয়ান নিট মুনাফা করেছিল।
তিনটি এয়ারলাইন্সই চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সামগ্রিকভাবে লোকসান করেছে। বিপরীতে গত বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফায় ছিল।
চীনের এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য বছরের তৃতীয় প্রান্তিক সাধারণত সবচেয়ে লাভজনক সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ভ্রমণ চাহিদা বেশি থাকে।
তবে চলতি বছর এই মৌসুমেও প্রত্যাশিত আর্থিক সাফল্য পায়নি চীনের বড় তিন এয়ারলাইন্স।
গত বছরের একই সময়ে তুলনামূলক ভালো আর্থিক ফলাফল থাকায় এবার মুনাফা কমার হার আরও বেশি দেখা গেছে।
পাশাপাশি টাইফুনের কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন এবং জ্বালানির বাড়তি ব্যয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
চীনের এয়ারলাইন্সগুলোর আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উড়োজাহাজের জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
এয়ার চায়না, চায়না ইস্টার্ন ও চায়না সাউদার্ন—তিনটি প্রতিষ্ঠানই তৃতীয় প্রান্তিকে আর্থিক ফলাফল দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কথা জানিয়েছে।
অনেক এশীয় ও ইউরোপীয় এয়ারলাইন্সের তুলনায় চীনের বিমান সংস্থাগুলো জ্বালানির মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় তুলনামূলক কম হেজিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লে চীনের এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি চীনের অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতাও এয়ারলাইন্সগুলোর আয় কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে দেশটির বিস্তৃত উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রার অন্যতম প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে।
ফলে যাত্রী ধরে রাখতে অনেক রুটে তুলনামূলক কম ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করতে হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোকে।
হুয়াতাই সিকিউরিটিজের (Huatai Securities) হিসাব অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে এয়ার চায়নার যাত্রী পরিবহন থেকে অর্জিত গড় আয় বা ইয়েল্ড প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।
এতে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় সমন্বয় করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিওএফএ গ্লোবাল রিসার্চের এশিয়া-প্যাসিফিক পরিবহন গবেষণা বিভাগের প্রধান নাথান গি জানিয়েছেন, মৌসুমি কারণে তুলনামূলক দুর্বল চতুর্থ প্রান্তিকেও চীনের এয়ারলাইন্সগুলোর লোকসান অব্যাহত থাকতে পারে।
তাঁর মতে, তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফল অত্যন্ত কম প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো চ্যালেঞ্জিং।
তবে অক্টোবরের গোল্ডেন উইক ছুটির পর চীনের অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানভাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দুই অঙ্কের হারে বাড়তে শুরু করেছে।
এয়ারলাইন্সগুলো আসন সক্ষমতা ও ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ন্ত্রণে রাখায় ভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে জ্বালানির উচ্চমূল্য এখনো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক বাধা।
পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীনের এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিটি উড়োজাহাজের দৈনিক ব্যবহার বা ফ্লাইং আওয়ার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ পরিচালনার দক্ষতা বাড়িয়ে নির্দিষ্ট ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের কারণে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচন কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আর্থিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরেও।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এয়ার চায়নার শেয়ারদর ৩৮ শতাংশ, চায়না ইস্টার্নের ৪৬ শতাংশ এবং চায়না সাউদার্নের ৩৯ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল না হলে এবং যাত্রী পরিবহন থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে চীনের বৃহৎ এয়ারলাইন্সগুলোর আর্থিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি কঠিন হতে পারে।