
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চলমান চুক্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আগে আপত্তি জানানো চারটি শর্তে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আগামী ১৫ বছর প্রতিযোগী কোনো বেসামরিক বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু না করার শর্তেও সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এভিয়েশনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম Aviation Express-এর এক প্রতিবেদনে বেবিচকের আলোচনাপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সম্মতি দেওয়া শর্তগুলোর বিস্তারিত বিধান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তিতে চারটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
বিষয়গুলো হলো রাজস্ব ভাগাভাগি, বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চুক্তিগত বিধান, নির্মাণকাজের ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্যক্রমসংক্রান্ত শর্ত।
বেবিচক আগে এসব বিষয়ে আপত্তি জানালেও পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো অনুমোদন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলোচনাসংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চুক্তির সংশোধিত খসড়া জাপানি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর পরিচালনার ওপর ১৫ বছরের বিধিনিষেধ।
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পক্ষ এ শর্তে সম্মতি দিয়েছে।
তবে এই বিধিনিষেধের অর্থ নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ বা পরিকল্পনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা নয়।
কর্মকর্তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা গ্রহণ বা নির্মাণকাজ পরিচালনা করা যাবে। সামরিক স্থাপনা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও শর্তটি বাধা হবে না।
কিন্তু শাহজালালের প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচিত কোনো বেসামরিক বিমানবন্দরে ওই ১৫ বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা যাবে না।
এ শর্ত কার্যকর হলে রাজধানী ঢাকার আশপাশে ভবিষ্যতে নতুন বাণিজ্যিক বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে একটি রানওয়ের মাধ্যমে উড়োজাহাজ ওঠানামা পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে বিমানবন্দরের চারপাশে নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন স্বতন্ত্র রানওয়ে নির্মাণের সুযোগও সীমিত।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে শুধু টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেই রানওয়ের উড়োজাহাজ ওঠানামার সীমাবদ্ধতা দূর হবে না।
এ কারণে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ঢাকাকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনায় অতিরিক্ত রানওয়ে বা বিকল্প বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষণের বিষয় হলো, প্রস্তাবিত ১৫ বছরের বিধিনিষেধ ভবিষ্যতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও নতুন বিমানবন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে কতটা প্রভাবিত করবে।
তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা থেকে অর্জিত রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাজস্বের ২৭ শতাংশ বাংলাদেশ পক্ষের পাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে আংশিক কার্যক্রম থেকে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনায় যাওয়ার অন্তর্বর্তী সময়ে জাপানি অপারেটর কম হারে রাজস্ব ভাগ দেবে বলে জানিয়েছেন আলোচনাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মেহবুব খান।
তিনি নিশ্চিত করেছেন, মূল রাজস্ব ভাগাভাগির হার ২৭ শতাংশই থাকছে। তবে আংশিক পরিচালনার সময় এই পূর্ণ হার প্রযোজ্য হবে না।
এর আগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আট মাসের প্রস্তুতিকালীন সময়ে জাপানি কনসোর্টিয়াম ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য শেষ পর্যন্ত কত শতাংশ রাজস্ব ভাগাভাগির হার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কতদিন তা কার্যকর থাকবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে এই ছাড়ের কারণে বাংলাদেশ কতটুকু রাজস্ব পাবে বা সম্ভাব্য কতটুকু আয় কম হতে পারে, তা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত বিষয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভূমিকা ও আর্থিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স একই সঙ্গে একটি যাত্রীবাহী বিমান সংস্থা এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানি কনসোর্টিয়াম বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের জন্য প্রযোজ্য কিছু অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানটির পৃথক এয়ারলাইন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে চেয়েছে।
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ দুই ধরনের কার্যক্রমকে একইভাবে বিবেচনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এয়ারলাইন হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পৃথক।
তবে জাপানি পক্ষ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি উত্থাপন করার পর তাদের অবস্থানে সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্য দুটি বিতর্কিত শর্ত বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনের প্রভাব এবং নির্মাণকাজের ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা নিয়ে।
আগের আলোচনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে আইন পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বিশেষ চুক্তিগত সুরক্ষা চাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছিল।
একই সঙ্গে নির্মাণকাজের ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা নিয়েও মতপার্থক্য ছিল।
মন্ত্রণালয় এসব বিষয়ে সম্মতি দিলেও চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর চূড়ান্ত ভাষা প্রকাশিত হয়নি।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এককভাবে আলোচনা চালানোর কারণে বাংলাদেশের দরকষাকষির অবস্থান দুর্বল হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান এর আগে বিকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তাঁর মতে, গ্রহণযোগ্য বিকল্প না থাকলে একক সম্ভাব্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান চুক্তিতে নিজেদের অনুকূলে শর্ত আদায়ের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
জাপান তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ ও অর্থায়নে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। তবে প্রকল্পের অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন চুক্তির বাণিজ্যিক স্বার্থ এক বিষয় নয়।
এ অবস্থায় চুক্তির বিতর্কিত শর্তগুলোর অর্থনৈতিক ও পরিচালনগত যৌক্তিকতা প্রকাশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা শেষ হয়েছে এবং সংশোধিত চুক্তির খসড়া চূড়ান্তভাবে ধারা ধরে পর্যালোচনার জন্য জাপানি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এরপর চুক্তিটি আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করা কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে নভেম্বরের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প।
এই টার্মিনালের পরিচালন চুক্তি দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় এবং ভবিষ্যৎ এভিয়েশন অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এর গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও এভিয়েশন স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।