
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ কাটা, মালামাল চুরি ও ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রতিরোধে চালু হয়েছে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা। বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সরাসরি দেখতে পারছেন যাত্রীরা।
গত ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এ ব্যবস্থা চালু করে। নতুন উদ্যোগের ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি দ্রুত লাগেজ পাওয়া এবং সরাসরি নজরদারির সুযোগ তৈরি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করছেন অনেক যাত্রী।
প্রায় এক বছর পর ডিআর কঙ্গো থেকে দেশে ফিরেছেন ফেনীর বাসিন্দা আসিফ আলী। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শাহজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ বেল্টে পৌঁছেই নিজের ব্যাগ দেখতে পান তিনি।
আসিফ জানান, এর আগে দেশে ফেরার সময় লাগেজ পেতে অপেক্ষা করতে হলেও এবার তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। নতুন মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লাগেজের গতিবিধি দেখতে পারায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তাঁর মতে, প্রবাসীরা দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো কিংবা মালামাল চুরির মতো ঘটনার শিকার হলে তা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। নতুন নজরদারি ব্যবস্থা এ ধরনের অভিযোগ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করেন তিনি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরা নোয়াখালীর নোয়াব আলী। তিনি জানান, ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ বেল্টে যাওয়ার চার থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ব্যাগ পেয়েছেন।
ওমরাহ থেকে ফেরা আরেক যাত্রী রাশেদা বেগমও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা বা মালামাল হারানোর অভিযোগ আগে শুনলেও এবার তাঁর কোনো সমস্যা হয়নি।
নতুন ব্যবস্থায় বিমানবন্দরের প্রতিটি লাগেজ বেল্টের ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং এলাকায় চারটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
এসব ক্যামেরার মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং বেল্টে পৌঁছানোর বিভিন্ন ধাপ ধারণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দৃশ্যগুলো আগমন এলাকার বড় মনিটরে সরাসরি দেখানো হচ্ছে।
ফলে যাত্রীরা নিজেদের লাগেজের অবস্থান ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন।
বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানিয়েছেন, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও মনিটরের মাধ্যমে যাত্রীরা তাঁদের লাগেজের গতিবিধি সরাসরি দেখতে পারছেন।
বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা ও মালামাল চুরির অভিযোগ প্রতিরোধে এর আগে উচ্চপর্যায়ের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ছয় সদস্যের কমিটিতে বিমানবন্দর নিরাপত্তা, এয়ারলাইন পরিচালনা, গ্রাহকসেবা এবং ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা ছিলেন।
কমিটি তদন্ত ও মূল্যায়ন শেষে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি বাড়াতে ছয় দফা সুপারিশ করে।
কমিটির অন্যতম সুপারিশ ছিল উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে আগমন এলাকার বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া সিসিটিভির আওতাবহির্ভূত এলাকায় ক্যামেরা স্থাপন, লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহার এবং ধারণ করা ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়।
প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল, সার্বক্ষণিক নজরদারি, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাশাপাশি লাগেজ চুরি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে কমিটি।
লাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা যাত্রার মূল বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে শনাক্ত হলে আগাম সতর্কবার্তা, ছবিসহ ই-মেইল এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগে পরিচিতিমূলক স্টিকার ব্যবহারের বিষয়টিও সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ জানিয়েছেন, নতুন নজরদারি ব্যবস্থা চালুর ফলে লাগেজ কাটা ও মালামাল চুরির অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে তিনি আশা করছেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় যাত্রার মূল বিমানবন্দরে নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত সামগ্রী বহনের কারণে লাগেজ খুলে পরীক্ষা করা হয়। পরে গন্তব্য বিমানবন্দরে এসে যাত্রীরা লাগেজ কাটার অভিযোগ করেন।
নতুন ব্যবস্থায় লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকায় এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
লাগেজ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মীদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টিও উল্লেখ করেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক।
অন্যদিকে বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল জানিয়েছেন, যাত্রী ও তাঁদের মালামালের নিরাপত্তায় লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তাঁর মতে, যাত্রীরা ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ বেল্টে এসে নিজেদের ব্যাগের অবস্থান দেখতে পারছেন। একই সঙ্গে লাগেজ পেতে অপেক্ষা কমার বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে দেখছেন তাঁরা।
নতুন ক্যামেরা ও মনিটরিং ব্যবস্থা বিমানবন্দরের লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রমকে যাত্রীদের কাছে আরও দৃশ্যমান করেছে। এতে কর্মীদের জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি লাগেজের নিরাপত্তা নিয়ে যাত্রীদের উদ্বেগ কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে শুধু ক্যামেরা স্থাপন করলেই লাগেজ চুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সব ঘটনা বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত নজরদারি, ফুটেজ পর্যালোচনা, অভিযোগ তদন্ত এবং দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বেবিচক জানিয়েছে, যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।