
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দেশের বিমানবন্দরগুলোতে উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষ বা ‘বার্ড স্ট্রাইক’ প্রতিরোধে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ২১২টি বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই ঘটেছে ১৬৮টি। এমন পরিস্থিতিতে আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং পাখির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
বেবিচকের লক্ষ্য, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের সব সচল বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত পাখি তাড়ানোর সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া বক্তব্যে বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবলের ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বার্ড হ্যাজার্ড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বেবিচকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিমানবন্দরগুলোতে ২১২টি বার্ড স্ট্রাইক রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ সংখ্যা ছিল ২৩৯টি।
সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ১৬৮টি বার্ড স্ট্রাইক রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ গত বছরের পুরো সময়ে বিমানবন্দরটিতে এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৫৭টি।
অর্থাৎ ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যেই শাহজালাল বিমানবন্দরে পাখির আঘাতের ঘটনা ১১টি বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলতি বছর ১২টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গত বছর ছিল ৪০টি। সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ বছর আটটি এবং গত বছর ১৩টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে চলতি বছর একটি, রাজশাহীতে ১০টি এবং সৈয়দপুরে ১৩টি বার্ড স্ট্রাইক রেকর্ড করা হয়েছে। যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে উল্লিখিত দুই সময়ের কোনোটিতেই বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি।
বিমানবন্দরভিত্তিক বার্ড স্ট্রাইকের পরিসংখ্যান:
| বিমানবন্দর | ২০২৫ সাল | ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত |
|---|---|---|
| ঢাকা | ১৫৭ | ১৬৮ |
| চট্টগ্রাম | ৪০ | ১২ |
| সিলেট | ১৩ | ৮ |
| কক্সবাজার | ২ | ১ |
| রাজশাহী | ১০ | ১০ |
| সৈয়দপুর | ১৭ | ১৩ |
| যশোর | ০ | ০ |
| বরিশাল | ০ | ০ |
| মোট | ২৩৯ | ২১২ |
তবে ২০২৫ সালের পূর্ণ বছরের সঙ্গে ২০২৬ সালের আংশিক সময়ের তথ্য তুলনা করা হয়েছে। ফলে এ পরিসংখ্যান দিয়ে দেশব্যাপী বার্ড স্ট্রাইকের বার্ষিক হার কমেছে বা বেড়েছে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
পাখির আঘাত প্রতিরোধে দেশের আটটি বিমানবন্দরের সরঞ্জামের চাহিদা মূল্যায়ন করেছে বেবিচক।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, কার্যকর বার্ড কন্ট্রোল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মোট ২৬টি পাখি তাড়ানোর গান প্রয়োজন।
এর মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছয়টি, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে চারটি করে এবং রাজশাহী, সৈয়দপুর, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে দুটি করে সরঞ্জাম প্রয়োজন।
বর্তমানে বেবিচকের কাছে এ ধরনের ১১টি গান রয়েছে। তবে এর মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র দুটি। সচল সরঞ্জাম দুটি সিলেট ও বরিশাল বিমানবন্দরে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সরঞ্জামের লাইসেন্স নবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেবিচকের সদস্য মো. নূর-ই-আলম জানান, কার্যকর সরঞ্জামের সংখ্যা বাড়ানো গেলে রানওয়ে ও উড়োজাহাজ চলাচলের এলাকায় পাখির উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। বিশেষ করে উড্ডয়ন ও অবতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঝুঁকি কমাতে এসব সরঞ্জাম সহায়ক হবে।
সরঞ্জামের পাশাপাশি বার্ড কন্ট্রোল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনবলসংকটও রয়েছে বেবিচকের।
সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের আটটি বিমানবন্দরে মোট ৬৪ জন নিবেদিত বার্ড শুটার প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে অনুমোদিত পদ রয়েছে মাত্র ১০টি, যার মধ্যে কর্মরত আছেন চারজন।
প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে ১১ জন করে এবং রাজশাহী, সৈয়দপুর, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে পাঁচজন করে কর্মী প্রয়োজন হবে।
এ চাহিদা পূরণের জন্য বেবিচকের টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট (টিওঅ্যান্ডই) পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জনবল বাড়ানো গেলে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে সার্বক্ষণিক পাখি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে বেবিচকের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলাকালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর বিমানবন্দরে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বার্ড কন্ট্রোল কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে।
বার্ড স্ট্রাইক প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নিয়েছে বেবিচক।
সংস্থাটি পর্যায়ক্রমে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে আধুনিক বার্ড কন্ট্রোল মনিটরিং সিস্টেম (বিসিএমএস) চালু করতে চায়।
বেবিচকের সদস্য জানিয়েছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে একটি কার্যকর বিসিএমএস রয়েছে। এই ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে অন্য বিমানবন্দরগুলোতেও একই ধরনের প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাখির উপস্থিতি ও চলাচল পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে এ ধরনের প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
পাখি তাড়ানোর সরঞ্জাম সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতেও পদক্ষেপ নিয়েছে বেবিচক।
আগে বার্ড কন্ট্রোলের জন্য ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নামে দেওয়া হতো। ফলে লাইসেন্সধারী কর্মকর্তা বদলি হলে বা অবসরে গেলে সরঞ্জাম ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হতো।
সম্প্রতি বিধিগত ছাড়ের মাধ্যমে ব্যক্তির পরিবর্তে নির্ধারিত সরকারি পদের বিপরীতে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বেবিচকের প্রত্যাশা, এতে লাইসেন্স নবায়ন, নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রক্রিয়া সহজ হবে।
শুধু পাখি তাড়ানোর সরঞ্জাম ও জনবল বাড়িয়ে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে বেবিচক।
এ কারণে বিমানবন্দর ও আশপাশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিমানবন্দরের আশপাশে অতিরিক্ত ঝোপঝাড় ও গাছপালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও খাদ্যবর্জ্য জমে পাখির সমাগম বাড়ে, সেসব স্থান অপসারণে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
বেবিচকের সদস্য জানান, বিমানবন্দরের সীমানার বাইরেও পাখির উপস্থিতির কারণ থাকতে পারে। তাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এর আগে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় ঢাকায় ১১৫ থেকে ১২০ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ৬৬ থেকে ৬৭ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়।
গবেষণায় বিমানবন্দরের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ১২৯টি স্থান পর্যালোচনা করা হয়।
এসব এলাকায় ৩ হাজার ৮৮৬টি হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ৭৫৩টি কাঁচাবাজার, ৬৬৩টি পশু জবাইয়ের স্থান এবং ১ হাজার ৩৩৫টি বর্জ্য ফেলার কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়।
এ ধরনের স্থানে খাদ্যবর্জ্য ও অন্যান্য উপাদান পাখিকে আকৃষ্ট করতে পারে। ফলে বিমানবন্দরের আশপাশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বার্ড স্ট্রাইক ও বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়াতে সম্প্রতি একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রথম বৈঠক আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বেবিচকের সদস্য জানান, এ কমিটি বিমানবন্দরগুলোতে বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
তবে দেশব্যাপী সরঞ্জাম সংগ্রহ, জনবল নিয়োগ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষকে এভিয়েশনের ভাষায় বার্ড স্ট্রাইক বলা হয়।
এ ধরনের ঘটনা উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পাখির আঘাতে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, সামনের কাচ কিংবা অন্যান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে বার্ড স্ট্রাইকের কারণে ফ্লাইট বিলম্ব, উড়োজাহাজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হতে পারে।
শীতকাল সামনে রেখে পাখির চলাচল ও উপস্থিতিজনিত ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বেবিচক।
সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আধুনিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে বার্ড স্ট্রাইক প্রতিরোধের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।