
বিমানবন্দরের সেবা ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত বিভিন্ন চার্জ দীর্ঘদিন বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট বিমান জব্দ, নিলাম কিংবা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারবে কর্তৃপক্ষ। নতুন ‘বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’-এ এ ধরনের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো এয়ারলাইনসের কাছে ১২০ দিনের চার্জ বকেয়া থাকলে তাকে ৩০ দিনের নোটিশ দেওয়া যাবে। এরপরও পাওনা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট বিমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে বকেয়া আদায়ে কঠোর বিধান যুক্ত হলেও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাঁচ এয়ারলাইনসের কাছে মোট পাওনা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৮৩ শতাংশই রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে। ফলে দীর্ঘদিনের এই বিপুল বকেয়া নতুন বিধিমালার মাধ্যমে কতটা আদায় করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বেবিচকের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে সংস্থাটির পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিল বাবদ পাওনা প্রায় ৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা।
এ ছাড়া চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৭৮১ কোটি এবং সিলেটে ৬০৩ কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। অন্যান্য বিমানবন্দরেও বিমানের কাছে বকেয়া রয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে প্রায় ৫১২ কোটি টাকার ভ্যাট এবং ৫৩ লাখ টাকার আয়করও রয়েছে।
বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে বেবিচকের পাওনা ৪১১ কোটি টাকা, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে ৪৫৪ কোটি এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের কাছে প্রায় ৩৯১ কোটি টাকা। বর্তমানে চালু থাকা নভোএয়ারের কাছে পাওনা প্রায় ১৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও এয়ার অ্যাস্ট্রার কাছে বর্তমানে কোনো বকেয়া নেই বলে জানা গেছে।
বকেয়া আদায়ে বেসরকারি এয়ারলাইনসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমানের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় না—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, বকেয়া আদায়ে বেবিচকের নীতিতে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত সারচার্জের কারণে অতীতে কয়েকটি দেশীয় এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বিমানসহ সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তিনি বিমানের বকেয়া সর্বোচ্চ পাঁচ বছরে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এতে বেবিচকের রাজস্ব আদায় যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি এককালীন বড় আর্থিক চাপ থেকেও এয়ারলাইনসগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে।
নতুন বিধিমালায় উড়োজাহাজের দিকে লেজার বা অন্য কোনো আলো নিক্ষেপ করে পাইলটের দৃষ্টিতে বিঘ্ন সৃষ্টি কিংবা উড্ডয়ন ও অবতরণে বাধা তৈরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ করে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় এ ধরনের আলো পাইলটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিমান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, সনদ ও অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘন বা নিরাপত্তার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স কিংবা এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট স্থগিত বা বাতিল করা যেতে পারে।
নতুন বিধিমালায় ফ্লাইট ক্রু ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের জন্যও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের আগের ১২ ঘণ্টার মধ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে সাধারণভাবে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুমোদিত ক্ষেত্রে কার্গো বা ডাক পরিবহনের সুযোগ রাখা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া বিমানে অস্ত্র বহন এবং নিরাপত্তাবিধি না মেনে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি ছয় মাসে পরিদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় সনদ এবং দাহ্য তরল সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিমানে বিশৃঙ্খল আচরণ, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা ক্রুদের নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়া বা তার যাত্রা বন্ধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিমানবন্দর ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও বিধান রয়েছে।
নতুন বিধিমালায় ড্রোনসহ চালকবিহীন উড়োজাহাজ পরিচালনা, বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং পাখি ও বন্য প্রাণীর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি কমানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে ১৯৮৪ সালের বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা রহিত করা হয়েছে। এতে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, লাইসেন্স ও অনুমোদন, যাত্রী আচরণ, বিমানবন্দর নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বিভিন্ন চার্জ আদায়ের বিষয়ে নতুন ও বিস্তারিত বিধান যুক্ত হয়েছে।
নতুন নিয়মে বকেয়া আদায়ে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা স্পষ্ট করা হলেও দীর্ঘদিনের বিপুল পাওনা বাস্তবে কতটা আদায় করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিপুল বকেয়ার ক্ষেত্রেও যদি একইভাবে বিধান প্রয়োগ করা হয়, তবেই নতুন বিধিমালার কার্যকারিতা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে।
সূত্র: বেবিচক