
দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বাড়াতে ১১ দফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে ভিআইপি ও সিআইপি লাউঞ্জসংলগ্ন পার্কিং এলাকায় গাড়ির নিচের অংশ স্ক্যানিং, অননুমোদিত ড্রোন প্রতিরোধ, লাগেজে বিশেষ নিরাপত্তা ট্যাগ এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কার্যক্রমে একক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) আসন্ন নিরাপত্তা মূল্যায়ন সফল করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি ও সিআইপি লাউঞ্জসংলগ্ন গাড়ি পার্কিং এলাকায় ডিসেম্বরের মধ্যে আন্ডার ভেহিক্যাল স্ক্যানিং সিস্টেম (UVSS) স্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে গাড়ির নিচের অংশ পরীক্ষা করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ভিআইপি ও সিআইপি যাত্রীদের কাস্টমস স্ক্রিনিং যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
বিমানবন্দরে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অধীনে একক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে বেবিচক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দর এলাকায় অননুমোদিত ড্রোন উড্ডয়ন বন্ধে দ্রুত প্রতিরোধব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা কেনার প্রক্রিয়াও দ্রুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ অননুমোদিত ড্রোন উড্ডয়ন উড়োজাহাজ চলাচল ও বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যাত্রীর অনুপস্থিতিতে অথবা ট্রানজিটের সময় নিরাপত্তার কারণে কোনো লাগেজ খুলতে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্টকে নির্ধারিত সিল বা ট্যাগযুক্ত স্টিকার লাগাতে হবে।
এতে কোনো লাগেজ যাত্রার পথে বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কারণে খোলা হয়েছিল কি না, তা সহজে শনাক্ত করা যাবে। ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বাড়বে।
ভিআইপি ও সিআইপি ইমিগ্রেশন এলাকায় অননুমোদিত প্রটোকল প্রদানকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হবে। এ ধরনের সুবিধা নিতে মিশনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
এ বিষয়ে বিদেশি দূতাবাসগুলোকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ভিআইপি ও সিআইপি যাত্রীদের কাস্টমস স্ক্রিনিং নিয়েও সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোকে জাতীয় বেসামরিক বিমান নিরাপত্তা কর্মসূচি ও এয়ার নেভিগেশন অর্ডার অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্বের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) প্রণয়ন করতে হবে।
এসব এসওপি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৈরি করে বেবিচকের অনুমোদন নিতে হবে। এতে বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব ও করণীয় আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের রপ্তানি কার্গোর ওপর থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কার্গো ও মেইলসংক্রান্ত মর্যাদা প্রত্যাহারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত রানওয়ের সমুদ্রবক্ষে স্থাপিত প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেমের তার ও যন্ত্রাংশ চুরি ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল জানান, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু ঘাটতি চিহ্নিত করে তা সমাধানে মন্ত্রী ইতোমধ্যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং এপিবিএনের দায়িত্ব পালনের জন্য এসওপি প্রণয়নের নির্দেশনাও রয়েছে।
তিনি জানান, আসন্ন নিরাপত্তা অডিটের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। নতুন সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরের প্রবেশপথ, যাত্রীসেবা, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমে নজরদারি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোর্স: বেবিচক