
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভবনের সামনে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইনসের ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ অপসারণ ও নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। উড়োজাহাজগুলো কেনার জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলেও সর্বোচ্চ দর পাওয়া গেছে তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা করসহ প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরানো গেলে বিমানবন্দরের প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখলমুক্ত হবে। সেখানে আনুমানিক ১২টি নতুন উড়োজাহাজ পার্কিং বে নির্মাণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিমানবন্দরের পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইনসের এসব উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে।
উড়োজাহাজগুলোর উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করে নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোকে উড়োজাহাজ সরিয়ে নিতে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও সেগুলো অপসারণ করা হয়নি।
পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত নোটিশ, বেবিচকের গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং আইনগত বিষয় পর্যালোচনা করে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্তের আদেশ জারি করা হয়। একই বছরের ১ জুন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস, ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো কেনার জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান লিখিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস, সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দর প্রস্তাব করেছে এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস। মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য ৪ কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। করসহ মোট প্রস্তাবিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬২৫ টাকা।
অন্যদিকে সেনা কল্যাণ সংস্থা কর ছাড়া ৩ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দর প্রস্তাব করেছে।
গত ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বেবিচকের ৩২০তম বোর্ড সভায় পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলোর অপসারণ ও নিলামে বিক্রির বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্তের আইনগত প্রক্রিয়া, নিলামের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ এবং আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়।
এর আগে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেয়।
বোর্ড সভায় সর্বোচ্চ দরদাতার প্রস্তাবকে ভিত্তি ধরে নিলামের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।
সে অনুযায়ী এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেসের প্রস্তাবিত তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারকে ভিত্তিমূল্য ধরে অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক।
পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলোর আর্থিক মূল্যের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে থাকা।
বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, উড়োজাহাজ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে।
এ কারণে উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো ওঠানামা এবং বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জায়গাটি দখলমুক্ত করা গেলে আনুমানিক ১২টি নতুন পার্কিং বে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ রাখার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অ্যারোনটিক্যাল সেবা থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উড়োজাহাজগুলোর মালিকানা ও ঋণের দায় নিয়ে আইনি জটিলতাও রয়েছে।
আইনি মতামত অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্তের আদেশ বাতিল চেয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ অর্থঋণ আদালতে আবেদন করেছে। সংশ্লিষ্ট মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে রয়েছে।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে দেওয়া আইনি মতামতে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ আপাতত বেবিচকের পৃথক হিসাবে জমা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্যানেল আইনজীবীর চূড়ান্ত মতামত এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান দৈনিক আমাদের সময়কে বলেন, “তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিমান ক্রয়ের প্রস্তাবনা পেয়েছি। সেখান থেকে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন আসার পরে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা উড়োজাহাজগুলো দ্রুত অপসারণ করা গেলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হবে। একই সঙ্গে পার্কিং সুবিধা সম্প্রসারণ, কার্গো কার্যক্রম সহজ করা এবং বিমানবন্দরের পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নিলাম ও অপসারণ কার্যক্রমের চূড়ান্ত অগ্রগতি এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে।
সূত্র: বেবিচক