
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে গত পাঁচ বছরে উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষের (বার্ড স্ট্রাইক) মোট ২৭৭টি ঘটনা ঘটেছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান বার্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক সরঞ্জামভিত্তিক করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বার্ড স্ট্রাইক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাঝুঁকি। বিশেষ করে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় পাখির সঙ্গে সংঘর্ষ হলে ইঞ্জিন, উইন্ডশিল্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন, জরুরি অবতরণ, উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং যাত্রীনিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পাঁচ বছরে ২৭৭টি বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা বিমানবন্দরগুলোতে পাখির উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৫৫টি করে এমন ঘটনা ঘটেছে।
তবে শুধু সংঘর্ষের সংখ্যা দিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পুরোপুরি মূল্যায়ন করা যায় না। এ জন্য প্রতিটি ঘটনার সময়, স্থান, পাখির ধরন, উড়োজাহাজের ক্ষয়ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলের পরিমাণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোন বিমানবন্দরে, কোন মৌসুমে এবং দিনের কোন সময়ে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি বেশি থাকে, তা চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিমানবন্দরগুলোতে পাখি তাড়ানোর প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ানো হলে বার্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে বার্ড ডিটেকশন রাডার, থার্মাল ক্যামেরা, দূরনিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, অনুমোদিত শব্দভিত্তিক পাখি প্রতিরোধ সরঞ্জাম এবং আধুনিক বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে বার্ড ডিটেকশন রাডারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের আশপাশে পাখির গতিবিধি, অবস্থান ও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এসব তথ্য ব্যবহার করে বিমানবন্দর পরিচালনা ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বাড়ানো যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর অপারেশনাল পদ্ধতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বার্ড স্ট্রাইক প্রতিরোধে শুধু রানওয়ে বা বিমানবন্দরের ভেতরে পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বিমানবন্দরের আশপাশে উন্মুক্ত বর্জ্য, জলাবদ্ধতা, খাদ্যের উৎস এবং পাখি আকৃষ্ট করে এমন পরিবেশও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ কারণে বিমানবন্দর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, ঘাস ও উদ্ভিদ ব্যবস্থাপনা এবং আশপাশের ভূমি ব্যবহারের ওপর সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) বিমানবন্দরগুলোতে বন্যপ্রাণীজনিত ঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ জন্য নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, ঘটনার বিশ্লেষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতেও বার্ড স্ট্রাইকের তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিশেষায়িত সরঞ্জামের চাহিদা নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পাশাপাশি বার্ড কন্ট্রোল ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবলের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিয়মিত কার্যকারিতা মূল্যায়ন নিরাপদ বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
বার্ড স্ট্রাইক সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ানোই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
বিশেষ করে আধুনিক সরঞ্জাম, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হলে বিমানবন্দরগুলোতে পাখির কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
পাঁচ বছরে ২৭৭টি বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা দেশের বিমানবন্দরগুলোর বিদ্যমান প্রতিরোধব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও আধুনিক, কার্যকর ও সরঞ্জামভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সূত্র: বেবিচক