
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন যাচাই ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সি ও অসাধু চক্রের যোগসাজশে ভুয়া ভিসা, জাল কাগজপত্র কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়েও কোনো কোনো যাত্রী ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া পার হয়ে বিদেশে যাচ্ছেন। তবে গন্তব্য দেশের ইমিগ্রেশনে যাচাইয়ের সময় অসঙ্গতি ধরা পড়লে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে সাতটি দেশ থেকে পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশি যাত্রী ফেরত এসেছেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়াগামী ৭১ জন যাত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধানে বেশ কিছু অসঙ্গতির তথ্য সামনে আসে।
বিমানবন্দর সূত্র বলছে, নকল ভিসা, ভুয়া হোটেল বুকিং, পর্যাপ্ত ডলার এনডোর্সমেন্ট না থাকা এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্তোষজনক তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিদিনই বিভিন্ন যাত্রীকে অফলোড করা হচ্ছে। গত দেড় বছরে শুধু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই প্রায় সাড়ে ৯ হাজার যাত্রীর বিদেশযাত্রা ঠেকানো হয়েছে। তাঁদের বড় একটি অংশ মালয়েশিয়াগামী ছিলেন।
অনুসন্ধানে বিভিন্ন যাত্রীর কাগজপত্র ও বক্তব্যে অসঙ্গতির উদাহরণও পাওয়া গেছে। সৌদি আরবে স্পাউস ভিসায় যেতে আসা এক নারী তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, আইভরি কোস্টগামী এক যাত্রীর ভিসায় তাঁকে কারখানা শ্রমিক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নিজের কর্মস্থল ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তিনি। একই ধরনের অসঙ্গতিতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও নেপালগামী আরও কয়েকজন যাত্রীকে অফলোড করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী অফলোড হওয়া কোনো যাত্রীর বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, অসাধু কিছু ব্যক্তি বিশেষ প্রক্রিয়া বা কোড ব্যবহার করে সন্দেহজনক কাগজপত্রধারী যাত্রীদের ইমিগ্রেশন পার হতে সহায়তা করছেন। ফলে বিদেশের বিমানবন্দরে যাচাইয়ের সময় অনেকে আটক হয়ে দেশে ফেরত আসছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক আল আমিন নয়ন বলেন, দুর্বল বা ভুয়া ভিসাধারী যাত্রীদের লক্ষ্য করে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বের হওয়ার পর গন্তব্য দেশের ইমিগ্রেশনে আটকে যাত্রী ফেরত আসার ঘটনা দেশীয় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগে বিমানবন্দর পুলিশ ৬৪ যাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এরপরও কীভাবে কিছু যাত্রী যাচাইয়ের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বিদেশে যেতে সক্ষম হচ্ছেন, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন অপারেশন্সের ভারপ্রাপ্ত বিশেষ পুলিশ সুপার প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিক প্রেরণকারী দেশ হিসেবে এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের সুনামের জন্য উদ্বেগের। তাঁদের মতে, শুধু যাত্রী বা শ্রমিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সি, দালালচক্র, মানবপাচারকারী এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন যাচাই আরও শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করা গেলে অনিয়ম ঠেকানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।