
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। যাত্রী ও উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের (DfT) নিরাপত্তা মূল্যায়নে দেশের দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফলাফলেও উন্নতি দেখা গেছে। এতে বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার চলমান উদ্যোগের অগ্রগতি প্রতিফলিত হয়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের DfT-এর সর্বশেষ নিরাপত্তা মূল্যায়নে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৪ শতাংশ এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছে।
২০২৫ সালের মূল্যায়নে শাহজালালের স্কোর ছিল ৯৩ শতাংশ এবং ওসমানীর ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিমানবন্দর দুটির স্কোর যথাক্রমে ১ ও ৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
একই মূল্যায়নে অতিরিক্ত কার্গো নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্ষেত্রে শতভাগ কমপ্লায়েন্স অর্জনের তথ্য জানিয়েছে বেবিচক।
মূল্যায়নে যুক্তরাজ্যগামী যাত্রী, কার্গো ও ডাক পরিবহনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রবেশপথ এবং সংরক্ষিত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে শাহজালালসহ দেশের আটটি বিমানবন্দরে অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজরদারি, নিরাপত্তা তল্লাশি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৫টি উন্নত এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর (ETD) স্থাপন করা হয়েছে।
এসব যন্ত্রের মাধ্যমে বিস্ফোরক ও অবৈধ মাদকজাতীয় পদার্থের অতি ক্ষুদ্র চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব।
নতুন সরঞ্জাম পরিচালনার জন্য ৪৪ জন এভিয়েশন সিকিউরিটি (AVSEC) কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে যন্ত্র পরিচালনা, নমুনা সংগ্রহ, শনাক্তকরণ পদ্ধতি এবং পরিচালন নিরাপত্তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশির সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় অননুমোদিত প্রবেশ প্রতিরোধেও বেবিচক বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। শাহজালালে অনুমোদিত এভিয়েশন সিকিউরিটি আইডেন্টিফিকেশন (AvSecID) ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
পাশাপাশি বিমানবন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামো, যাত্রী ও ফ্লাইটসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম–কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচের (USAP-CMA) আওতায় বাংলাদেশের বিমান চলাচল নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়নের সূচি রয়েছে।
এই নিরীক্ষায় বেবিচকের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং বিমানবন্দর পর্যায়ে নিরাপত্তা কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে।
আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিবিধান ও কার্যক্রম আরও সুসংহত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের ফলাফল, উন্নত প্রযুক্তি সংযোজন এবং দেশব্যাপী নিরাপত্তা নজরদারি বৃদ্ধির তথ্য দেশের বিমানবন্দর নিরাপত্তাব্যবস্থায় অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে।
তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কার্যকর তদারকি, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
বেবিচকের চলমান উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে যাত্রী, এয়ারলাইনস এবং আন্তর্জাতিক অংশীজনদের আস্থা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।