
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
বার্ষিক প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী সামলানোর সক্ষমতার অবকাঠামো, অথচ সেই সক্ষমতার সীমা অনেক আগেই ছাড়িয়েছে যাত্রীর চাপ। বছরে এখন ১ কোটি ২৬ লাখেরও বেশি যাত্রীকে সেবা দিতে হচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে। অর্থাৎ পরিকল্পিত সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪৬ লাখের বেশি অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ নিয়েই সচল রয়েছে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
এত বড় যাত্রীর চাপের মধ্যে প্রতিদিনের ফ্লাইট অপারেশন, নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন, ব্যাগেজ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, যাত্রী ব্যবস্থাপনা এবং বিমানবন্দরের অন্যান্য কার্যক্রম সচল রাখা সহজ কাজ নয়। সীমিত সক্ষমতার পুরোনো টার্মিনাল অবকাঠামো ব্যবহার করেই বাড়তি এই চাপ সামলাতে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হচ্ছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে।
যাত্রীদের চোখে হয়তো বেশি পড়ে অপেক্ষার সময়, যানজট, ব্যাগেজ পেতে দেরি কিংবা টার্মিনালের ভিড়। কিন্তু এর পেছনে যে একটি বিমানবন্দর তার পরিকল্পিত সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী সামলে প্রতিদিনের অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে—সেই বাস্তবতাটিও আলোচনায় থাকা প্রয়োজন।
৮০ লাখের সক্ষমতার বিপরীতে ১ কোটি ২৬ লাখের বেশি যাত্রী মানে শাহজালালকে তার পরিকল্পিত সক্ষমতার প্রায় দেড় গুণ যাত্রীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।
শুধু যাত্রীর সংখ্যাই নয়, এর সঙ্গে বাড়ছে ফ্লাইট, ব্যাগেজ, দর্শনার্থী, নিরাপত্তা তল্লাশি, ইমিগ্রেশন কার্যক্রম, গাড়ির চাপ এবং যাত্রীসেবার অন্যান্য চাহিদা।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী বাড়ার অর্থ পুরো অপারেশনাল ব্যবস্থার ওপর আনুপাতিকভাবে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া।
তারপরও দেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে শাহজালালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
একটি ফ্লাইট নিরাপদে অবতরণ থেকে শুরু করে যাত্রী টার্মিনাল ছাড়ার আগ পর্যন্ত অনেকগুলো সংস্থা ও বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন হয়।
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, এয়ারপোর্ট অপারেশন, এভিয়েশন সিকিউরিটি, এয়ারলাইন্স, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, পুলিশ, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশল ও পরিচ্ছন্নতা—সব মিলিয়ে একটি বড় সমন্বিত ব্যবস্থার ওপর বিমানবন্দরের প্রতিদিনের কার্যক্রম নির্ভর করে।
বাড়তি যাত্রীর চাপ সামলাতে গিয়ে এই ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই কাজের পরিমাণ বাড়ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, “বিমানবন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই একাগ্রচিত্তে চেষ্টা করছেন বলেই বিদ্যমান সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক সম্মানিত যাত্রীকে প্রতিদিন সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। যাত্রীসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”
তিনি বলেন, যাত্রীর সংখ্যা ও অপারেশনাল চাপ বাড়লেও যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সেবা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরের প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্টরা আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফলে শাহজালালের যাত্রীসেবা মূল্যায়নের সময় দৃশ্যমান সমস্যার পাশাপাশি কতটা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পুরো বিমানবন্দর ব্যবস্থা কাজ করছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিমানবন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
যাত্রী ও স্বজনদের জন্য মাল্টিলেভেল কার পার্কিং ভবনে আধুনিক ‘যাত্রী অপেক্ষা’, বিমানবন্দর থেকে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে বিনামূল্যের শাটল বাস, অভিযোগ জানানোর জন্য ১৩৬০০ হটলাইন এবং বিভিন্ন যাত্রীসেবা কার্যক্রম এর অংশ।
এসব উদ্যোগ হয়তো বিমানবন্দরের মূল ধারণক্ষমতা বাড়ায় না, কিন্তু বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা সহজ করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী সামলানোর কারণে শাহজালালে যে কোনো সমস্যা নেই—এমনটিও নয়।
ব্যস্ত সময়ে টার্মিনালে ভিড়, ব্যাগেজ ডেলিভারি, গাড়ির চাপ, অপেক্ষার জায়গা এবং বিভিন্ন সেবা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে। এসব জায়গায় আরও উন্নতির প্রয়োজনও রয়েছে।
তবে সমস্যাগুলোর পাশাপাশি এর মূল কাঠামোগত কারণটিও গুরুত্বপূর্ণ—৮০ লাখ যাত্রীর জন্য তৈরি সক্ষমতা দিয়ে ১ কোটি ২৬ লাখের বেশি যাত্রীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ শুধু ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও যাত্রীসেবার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এই বাস্তবতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা গেলে বর্তমান টার্মিনালগুলোর ওপর যাত্রীর চাপ ভাগ হয়ে যাবে। আধুনিক চেক-ইন, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও যাত্রী ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো ব্যবহার করে বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে বাড়তে থাকা যাত্রীচাহিদা সামলানোর ক্ষেত্রেও নতুন অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি বিমানবন্দরের সেবায় ত্রুটি থাকলে তার সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক এবং যাত্রীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করাও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাটিও সামনে রাখা প্রয়োজন—পরিকল্পিত সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ বেশি যাত্রীর চাপ সামলে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি সচল রাখা হচ্ছে।
প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, শত শত অপারেশনাল কার্যক্রম এবং বিপুল ব্যাগেজ ও গ্রাউন্ড মুভমেন্টের মধ্যে এই কার্যক্রম সচল রাখতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বড় একটি কর্মযজ্ঞ চলছে।
সেই প্রচেষ্টা অনেক সময় যাত্রীদের চোখে সরাসরি দৃশ্যমান হয় না।
শাহজালালের সামনে তাই এখন দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ—বর্তমান অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত করা এবং নতুন অবকাঠামো দ্রুত কার্যকর করে বিমানবন্দরকে ভবিষ্যৎ যাত্রীচাহিদার জন্য প্রস্তুত করা।
৮০ লাখের সক্ষমতা নিয়ে ১ কোটি ২৬ লাখের বেশি যাত্রী সামলানোর বর্তমান বাস্তবতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—শাহজালালের সমস্যা শুধু সেবার নয়, এটি সক্ষমতা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার ব্যবধানেরও গল্প। আর সেই ব্যবধানের মধ্যেই প্রতিদিন সচল রাখা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)