
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে পূর্ণাঙ্গ যাত্রার পথে আরও এক ধাপ এগোল কক্সবাজার বিমানবন্দর। নবনির্মিত আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালে পরীক্ষামূলক যাত্রীসেবা ও ফ্লাইট-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নতুন অবকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো গেলে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রীসেবা সক্ষমতা বর্তমান প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ২০ লাখে পৌঁছাবে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর আগেই বাস্তব যাত্রী পরিচালনার মাধ্যমে টার্মিনালের বিভিন্ন অপারেশনাল ব্যবস্থা পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে নতুন টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পরিচিতি নতুন টার্মিনালের স্থাপত্যেও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
টার্মিনালের ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে ঝিনুকের আদলের নকশা। স্টিলের কাঠামোয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সমুদ্রের ঢেউয়ের আকৃতি। ফলে ভবনটির স্থাপত্যে কক্সবাজারের সমুদ্রকেন্দ্রিক পরিচয়ের প্রতিফলন দেখা যায়।
বর্তমানে টার্মিনালটি অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য ব্যবহার করা হলেও ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অবকাঠামোও এতে রাখা হয়েছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন অবকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো গেলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রীসেবা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসবে।
বর্তমান প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার যাত্রীর সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ২০ লাখে পৌঁছাবে।
বিশেষ করে পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুমে কক্সবাজার বিমানবন্দরে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। নতুন টার্মিনাল সেই চাপ সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৫৪টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করছে।
বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিমানবন্দরে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রোন।
সেখানে একই সময়ে দুটি ওয়াইডবডি এবং তিনটি ড্যাশ-এইট উড়োজাহাজ অবস্থান করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার মান যাচাইয়ের পর বিমানবন্দরটি ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (ICAO) সনদও পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা সামনে রেখে নতুন টার্মিনালে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
বহির্গমন অংশে রয়েছে চারটি ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং আগমন অংশে ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার। যাত্রীদের লাগেজ সংগ্রহের জন্য রয়েছে দুটি ব্যাগেজ বেল্ট।
এ ছাড়া রয়েছে ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, সিসিটিভি, ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিং ব্যবস্থা, চেক-ইন কাউন্টার, লিফট ও এস্কেলেটর।
আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য পৃথক আগমন ও বহির্গমন ব্যবস্থা এবং লাউঞ্জের পাশাপাশি ডিউটি ফ্রি শপ ও বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধাও রাখা হয়েছে।
এসব ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে একজন আন্তর্জাতিক যাত্রীর টার্মিনালে প্রবেশ থেকে শুরু করে চেক-ইন, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি এবং বোর্ডিং পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালের নিরাপত্তায় বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার সদস্যরা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইন্টারন্যাশনাল প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নতুন টার্মিনালে নিশ্চিত করা হয়েছে।
কক্সবাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হওয়ায় দেশি-বিদেশি যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন বিমানযাত্রা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রথম দিন নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করা যাত্রীদের অনেকেই অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণাধীন টার্মিনালটি সরাসরি ব্যবহার করতে পারা নিয়মিত কক্সবাজারগামী অনেক যাত্রীর জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।
যাত্রীদের কেউ কেউ টার্মিনালের নকশা ও সুযোগ-সুবিধার প্রশংসার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে সেবার মান ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কারণ একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে শুধু আধুনিক ভবন নির্মাণই যথেষ্ট নয়; চেক-ইন, নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, পরিচ্ছন্নতা ও বোর্ডিং ব্যবস্থার মান দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন টার্মিনালে বাস্তব যাত্রীসেবা শুরু হওয়ায় কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রস্তুতিও আরও দৃশ্যমান হলো।
প্রায় ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত আধুনিকায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও নতুন রানওয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু—দুটি পৃথক বিষয়। কোন এয়ারলাইন কোন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করবে এবং কবে থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইন্সের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই নিশ্চিত হবে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। ফলে বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক সক্ষমতা শুধু বিমান পরিবহন নয়, দেশের পর্যটন অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা হয়ে অভ্যন্তরীণ সংযোগ নেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়লে স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর ও অন্যান্য পর্যটননির্ভর ব্যবসায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে পরীক্ষামূলক যাত্রীসেবা শুরু তাই কেবল একটি নতুন ভবনের দরজা খোলা নয়—কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগে যুক্ত করার দীর্ঘ প্রস্তুতিকে বাস্তব অপারেশনে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)